ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞদের গবেষণার ফল

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জনে কমে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

খাদ্যতালিকা থেকে আল্ট্রাপ্রসেসড বা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ যত কমানো হবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কাও তত কমতে থাকবে

কারো খাদ্যতালিকায় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের মাত্রা ১০ শতাংশ বাড়লে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ঝুঁকি বাড়ে ১৭ শতাংশ। আর এর বিপরীতে কম প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ শঙ্কা আরো কমে আসে। যেমন খাদ্য তালিকার প্রতি ১০ শতাংশকে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারকে কম প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে এ রোগের ঝুঁকি কমে ৬ শতাংশ। আর অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারকে একই মাত্রায় সাধারণ প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে ৮ শতাংশ।

স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ নানা ধরনের অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়াচ্ছে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার। যদিও এ ধরনের খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা এখন দিনে দিনে বাড়ছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর বাসিন্দারা দৈনিক ক্যালোরির প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রহণ করে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে। আবার কিছু উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশে এ হার ওঠানামা করে প্রায় ২৫ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, খাদ্যতালিকা থেকে আল্ট্রাপ্রসেসড বা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ যত কমানো হবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কাও তত কমতে থাকবে।

সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকরা অন্যান্য নানা ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে নতুন এক গবেষণা চালান। এতে দেখা যায়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার যত গ্রহণ করা হয়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে। গবেষণাটির ফলাফল নিবন্ধ আকারে দ্য ল্যান্সেট রিজিওনাল হেলথ-ইউরোপ জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘ফুড কনজাম্পশন বাই দা ডিগ্রি অব ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড রিস্ক অব টাইপ ২ ডায়াবেটিস মেলিটাস: আ পার্সপেক্টিভ কোহোর্ট অ্যানালাইসিস অব দি ইউরোপিয়ান প্রসপেক্টিভ ইনভেস্টিগেশন ইনটু ক্যান্সার অ্যান্ড নিউট্রিশন’ শিরোনামে এটি প্রকাশিত হয়েছে।

ইউরোপের আটটি দেশের প্রায় ৩ লাখ ১২ হাজার মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ মানুষের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছে। তবে এ ধরনের খাবার গ্রহণের মাত্রা যত কমানো যায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তত কমে আসে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড়ে প্রায় ১১ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে উঠে আসে, কারো খাদ্যতালিকায় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের মাত্রা ১০ শতাংশ বাড়লে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ঝুঁকি বাড়ে ১৭ শতাংশ। আর এর বিপরীতে কম প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ শঙ্কা আরো কমে আসে। যেমন খাদ্য তালিকার প্রতি ১০ শতাংশকে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারকে কম প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে এ রোগের ঝুঁকি কমে ৬ শতাংশ। আর অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারকে একই মাত্রায় সাধারণ প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে ৮ শতাংশ।

এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার ফর ওবেসিটি রিসার্চের ডক্টরাল গবেষক স্যামুয়েল ডিকেন। তিনি বলেন, ‘অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সাধারণত অনেক উপাদান মিশিয়ে তৈরি হয়, এগুলোর অধিকাংশই আবার প্রচুর প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে যায়। এগুলোয় এমন উপাদান ব্যবহার হয়, যা সাধারণত বাড়িতে রান্নায় ব্যবহার হয় না—যেমন বিভিন্ন অ্যাডিটিভ, কৃত্রিম চর্বি, কার্বোহাইড্রেট বা প্রোটিন। এসব খাবার সব জায়গায়ই পাওয়া যায়। দাম কম, সহজলভ্য ও রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। আবার এগুলো নিয়ে প্রচার-প্রচারণাও অনেক। এর উদাহরণ হলো—চিনিযুক্ত পানীয়, রেডি মিল, লবণাক্ত স্ন্যাকস (যেমন চিপস), ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল ও উদ্ভিজ্জ উপাদাননির্ভর প্রক্রিয়াজাত বিকল্প খাবার।’

এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খেলে ৩২ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসার, হৃদরোগ, মেটাবলিক সিনড্রোম, নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস।

স্যামুয়েল ডিকেন বলেন, “আমাদের গবেষণার বিশেষ দিক হলো, আমরা শুধু অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নয়, বরং বিভিন্ন মাত্রার প্রক্রিয়াজাত খাবারকে আলাদাভাবে বিবেচনা করেছি। কোনটিকে কোন মাত্রার প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে ঝুঁকি কমে—তা আমরা বিশ্লেষণ করেছি। এদিক থেকে আমাদের গবেষণা নতুন। এটি থেকে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোয় সহায়ক ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ইটওয়েল গাইড বা যুক্তরাষ্ট্রের মাইপ্লেট অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় ও লবণাক্ত স্ন্যাকস এড়িয়ে চলা বিশেষভাবে জরুরি।’

গবেষণা নিবন্ধটি পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্যাসিফিক নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞ ডা. নোয়া টাল বলেন, ‘এর ফলাফলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আগের গবেষণাগুলোর সঙ্গেও এটি মিলে গেছে, যেখানে দেখা গেছে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার পরিপাকতন্ত্র, হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এ ফলাফলের এক আশাজনক দিক হলো যে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।’

আরও