উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মমুগ্ধতা

মানুষ কী ক্ষমতা পেয়ে অহংকারী হয়, নাকি অহংকারই তাকে ক্ষমতা এনে দেয়

উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে আত্মমুগ্ধ করে তোলে, আর সে আত্মমুগ্ধতা তাকে আরো বড় পদের জন্য ক্ষুধার্ত করে

কর্মক্ষেত্রে গ্র্যান্ডিওজ নার্সিসিস্টরা সবার সঙ্গে মিশে যাওয়া বা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার চেয়ে ‘সবার ওপরে’ থাকাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহকর্মীরা তাদের না ভালোবাসলে বা পছন্দ না করলে সমস্যা নেই। বরং তারা চায়, সবাই তাদের সমীহ করুক। করপোরেট নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এ মানসিকতা অনেক সময় কর্তৃত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করে

মানুষ কী সহজাত গুণ ও যোগ্যতার কারণে শীর্ষ পদে পৌঁছায়, নাকি উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাকে সফলতার চূড়ায় টেনে তোলে? করপোরেট সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বে প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব পার্সোনালিটি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এর উত্তর মিলেছে। গবেষকেরা বলছেন, মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মমুগ্ধতা বা ‘নার্সিসিজম’ মোটেও ভিন্ন দুটি বিষয় নয়; বরং এরা ‘দুষ্টচক্রের’ মতো পরস্পরকে জ্বালানি যোগায়।

কানাডার উইলফ্রিড লরিয়ার ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান জর্ডান ও গবেষক নিখিলা মহাদেবন ৫২৮ জন ব্যক্তির ওপর সমীক্ষা চালান। একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা, আত্মমুগ্ধতার মাত্রা ও নিজেদের পারিপার্শ্বিকতায় তারা কতটা প্রভাবশালী—এসব বিষয়ে নিবিড় মূল্যায়ন করা হয়।

আত্মমুগ্ধতার দুই রূপ

মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের আত্মমুগ্ধতা বা নার্সিসিজমকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করে বিশ্লেষণ করেছেন।

গ্র্যান্ডিওজ নার্সিসিজম: এ বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিরা অতিরিক্ত মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হন, সবসময় নিজেদের প্রচার বা ‘সেলফ-প্রোমোশন’-এ ব্যস্ত থাকেন। ফলে নিজেকে সবসময় অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেন।

ভালনারেবল নার্সিসিজম: এ ধরনের ব্যক্তিরাও ভেতরে ভেতরে উচ্চ পদের আকাঙ্ক্ষা রাখেন। তবে তারা তীব্র নিরাপত্তাহীনতা, আত্মরক্ষামূলক মনোভাব ও ব্যর্থতার ভয়ে ভোগেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মধ্যে ‘গ্র্যান্ডিওজ নার্সিসিজম’ বা উগ্র আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বেশি ছিল, সময়ের সঙ্গে সমাজে বা কর্মক্ষেত্রে উচ্চ পদ ও মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের মধ্যে বহুগুণ তীব্র হয়ে ওঠে। সেইসঙ্গে তারা নিজেদের বেশি প্রভাবশালী ও সম্মানিত মনে করতে শুরু করে।

মজার বিষয় হলো, এ চক্রের উল্টো পথটাও সমান সত্য। সমীক্ষা বলছে, যেসব ব্যক্তি কোনো উপায়ে কর্মক্ষেত্রে বা সমাজে উচ্চ মর্যাদার আসনে বসে যান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভেতরের উগ্র আত্মমুগ্ধতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে আত্মমুগ্ধ করে তোলে, আর সে আত্মমুগ্ধতা তাকে আরো বড় পদের জন্য ক্ষুধার্ত করে তোলে। এটিই হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মমোহের পারস্পরিক যুগলবন্দি।

কর্মক্ষেত্রে গ্র্যান্ডিওজ নার্সিসিস্টরা সবার সঙ্গে মিশে যাওয়া বা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার চেয়ে ‘সবার ওপরে’ থাকাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহকর্মীরা তাদের না ভালোবাসলে বা পছন্দ না করলে সমস্যা নেই। বরং তারা চায়, সবাই তাদের সমীহ করুক। করপোরেট নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এ মানসিকতা অনেক সময় কর্তৃত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করে।

অন্যদিকে, ‘ভালনারেবল নার্সিসিজম’ বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। এরা মনে মনে উচ্চ অবস্থান চাইলেও প্রতিযোগিতামূলক বা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাসের অভাবে নিজেদের গুটিয়ে যায়। ফলে সময়ের সঙ্গে এদের মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাও কমতে থাকে আর প্রতিষ্ঠান বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি ও বৃত্ত ভাঙার চাবিকাঠি

যেকোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য এ মনস্তাত্ত্বিক চক্রটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উগ্র আত্মমুগ্ধতার চক্রে পড়া ব্যক্তিরা নিজেদের জাহির করতে গিয়ে অনেক সময় দলের অন্যান্য দক্ষ কর্মীদের কোণঠাসা করে ফেলেন। তারা নিজেদের ভুলত্রুটি দেখতে পান না এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচারকে বড় করে দেখেন।

তবে এ গোলকধাঁধা বা মনস্তাত্ত্বিক জাল থেকে বের হওয়ার একটি কার্যকর উপায়ও দেখিয়েছেন অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান জর্ডান ও নিখিলা মহাদেবন। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মধ্যে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক একাত্মতা বা ‘বিলঙ্গিংনেস’ বেশি, তাদের মধ্যে আত্মমুগ্ধতার প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে।

গবেষক দলের মতে, সুস্থ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও দৃঢ় মানবিক সম্পর্ক এ বৃত্ত ভাঙার মূল চাবিকাঠি। কোনো প্রতিষ্ঠানে যখন একজন কর্মী সুস্থ কাজের পরিবেশ, ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি ও প্রতিস্ঠানকে আপন করে নেয়ার অনুভূতি লাভ করে, তখন কৃত্রিম উপায়ে নিজেকে জাহির করার বা অন্যায্য ক্ষমতার পেছনে ছোটার অন্ধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে।

আরও