“এখন আমার কাছে এ শহর বড় বেশি ধূসর
ধূসর বলে মনে হয়”
সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার শহর’ রাজধানী ঢাকা ঘিরে লেখা দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটি শুরু হয়েছে উক্ত দুই লাইন দিয়ে। দুটো লাইনই যেন কবিমনের সব ভাব তুলে ধরেছে পাঠকের কাছে। এ অনুভবে জমা দীর্ঘশ্বাস টের পাওয়া যায়, টের পাওয়া যায় গভীর আক্ষেপ। দীর্ঘকাল মানুষ যখন কোনো শহরে বাস করে, সেই শহরের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শহরের রূপ বদলে গেলে তাই জীবনের রঙও বদলাতে থাকে। কবির জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। সেই বদলে যাওয়া শহর আর জীবনের গল্পই কবি লিখেছেন কবিতার স্তবকে—
“আমি যাকে চিনতাম
যার বুক ভেঙে আমি পুরানা পল্টন ঘিরে
হাঁটতাম দুপুরে গভীরে
প্রথম প্রেমের মতো যার গলা হঠাৎ জড়িয়ে
কবিতা লেখার হাতে—
এই দুটো হাতে—
দুঃখসুখ মেশানো দু’চোখে আমি কাঁদতাম,
আমার শহর সেই ডুবে গেছে কোন কালীদহে?”
‘আমার শহর’ কবিতাটি মূলত কবির রজ্জুপথে চলেছি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত। কবিতাটি আলাদা বই হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে মূলত প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রয়াসে। ২০১৯ সালে 'প্রথমা প্রকাশন' বইটি প্রথম প্রকাশ করে। এর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী।
সৈয়দ শামসুল হক জন্মেছিলেন কুড়িগ্রাম জেলায়। তিনি ঢাকায় আসেন ১৯৪৮ সালে। এ শহরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ২০১৬ সালে, ৮০ বছর বয়সে। তাই সব্যসাচী এ লেখকের জীবনের বড় অংশজুড়ে ছিল ঢাকা। মৃত্যু অব্দি তিনি দেখেছেন ঢাকার আমূল রূপান্তর। তিনি দেখেছেন সবুজ ঢাকা ক্রমান্বয়ে কীভাবে ইট-পাথরের জঙ্গলে পরিণত হলো। আর তার ভেতরে বাসা বাঁধলো শহরের প্রতি মায়াময় বেদনা। সেই বেদনার আর্তনাদ তিনি লিখে গেছেন বইয়ের পাতায় পাতায়—
“নদীর কান্নার মতো শব্দ ওঠে এ শহরের সমস্ত মিছিলে,
আমার কবিতা হাঁটে তারই সাথে
ঢাকা নামে নগরীর ফোরাতের তীরে।”