কুরুক্ষেত্রের যতদূর চোখ যায় দৃষ্টিতে আসে দুই পক্ষের বিশাল সৈন্য সমাগম। পঞ্চপাণ্ডব (যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব)-এর হয়ে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও তাদের প্রধান সহায়তাকারী শ্রীকৃষ্ণ। এছাড়াও পাণ্ডব পক্ষে আছে বিরাট, দ্রুপদ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, সাত্যকি, পাণ্ড্যরাজ, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যুযুৎসুসহ বহু রাজা ও মিত্রশক্তি। সবমিলিয়ে ৭ অক্ষৌহিণী সৈন্য। আর কৌরবপক্ষে দুর্যোধন ও তার ৯৯ ভাই, ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, শল্য, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, শকুনি, জয়দ্রথসহ ১১ অক্ষৌহিণী সৈন্য।
কুরুক্ষেত্র কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, ন্যায় ও অধর্মের সংঘর্ষেরও প্রতীক। যুদ্ধে যে-ই নিহত হোক, তারা সবাই একই কুরুবংশের মানুষ। তাই নিজগোত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে শুরুতে অনীহা ছিল পাণ্ডবদের। অর্ধেক রাজ্যের দাবি ত্যাগ করে মাত্র পাঁচটি গ্রাম চেয়েছিল পাণ্ডুপুত্ররা। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রপুত্ররা তাতেও রাজি হয়নি। এর আগে কুট পাশা খেলায় পাণ্ডবদের পরাজিত করে তাদের ১২ বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাসে পাঠানো হয়।
এই উত্তাল ইতিহাসকেই উপন্যাসের আঙ্গিকে রূপ দিয়েছেন লেখক বনানী রায় তার গ্রন্থ কুরুক্ষেত্র-এ। ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারত-এর সুপরিচিত ঘটনাপ্রবাহ এখানে ধারাবাহিক কাহিনীরূপে বিন্যস্ত হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের অনিবার্যতার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় গল্প। উপন্যাসে পাশা খেলার অপমানজনক ঘটনার পর পাণ্ডবদের দীর্ঘ বনবাসের জীবনও উঠে এসেছে। বনবাসে তারা শুধু দুঃখকষ্টই ভোগ করেনি, বরং নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেদের শক্তি ও সমর্থনও গড়ে তোলে। সেই সময়েই তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় বহু মিত্রশক্তি।
অজ্ঞাতবাস শেষ করে ফিরে এসে পাণ্ডবরা যখন তাদের ন্যায্য অধিকার দাবি করে, তখন সংঘাত আর এড়ানো সম্ভব হয় না। শান্তির শেষ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকা। তিনি পাণ্ডবদের মিত্র ও পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হন। যুদ্ধ এড়ানোর শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হলে দুই পক্ষই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এক মহাসংঘর্ষের জন্য। যুদ্ধের আগে দুই পক্ষের রাজনৈতিক কূটনীতি, জোটবদ্ধতা এবং যুদ্ধপ্রস্তুতির চিত্র উপন্যাসে ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়।
এরপর কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ। আঠারো দিনের এ যুদ্ধে প্রতিদিনই বদলে যায় শক্তির ভারসাম্য। কখনও ভীষ্ম, কখনও দ্রোণ, আবার কখনও কর্ণের মতো যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। যুদ্ধ এগোতে থাকলে একে একে পতন ঘটে কুরু ও পাণ্ডব উভয় পক্ষের বহু বীর যোদ্ধার। যুদ্ধক্ষেত্রে নানা কৌশল, বীরত্ব এবং ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত কৌরবদের পতন ঘটে।
তবে এ যুদ্ধ কেবল রাজ্য দখলের লড়াই নয়—এটি ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘর্ষ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। যুদ্ধ শেষে কৌরবদের পতনের মধ্য দিয়ে পাণ্ডবদের বিজয় নিশ্চিত হয়। কিন্তু সেই বিজয়ের মধ্যেও থেকে যায় গভীর শোক ও ধ্বংসের স্মৃতি।
বনানী রায়ের উপন্যাসটি মহাভারতের বিস্তৃত কাহিনীকে সংক্ষিপ্ত ও উপন্যাসধর্মী আকারে তুলে ধরার চেষ্টা। পরিচিত পৌরাণিক ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিক গল্পে বিন্যস্ত করায় বইটি একদিকে যেমন যুদ্ধের মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি ধরে রাখে, অন্যদিকে পাঠকের জন্য তৈরি করে সহজ ও আকর্ষণীয় পাঠানুভূতি।
লেখক কাহিনীকে মহাকাব্যিক বর্ণনার বদলে আধুনিক উপন্যাসধর্মী কাঠামোয় সাজিয়েছেন। এতে চরিত্রগুলোর মানসিক টানাপোড়েনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যুধিষ্ঠিরের যুদ্ধবিমুখতা, নিজের বংশের ধ্বংস নিয়ে তার দ্বিধা এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অনিবার্যতা—এই দিকগুলো গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের কৌশলী ও পথপ্রদর্শক ভূমিকা কাহিনীতে বিশেষভাবে উপস্থিত।
ভাষা ও বর্ণনার দিক থেকে বইটি তুলনামূলক সহজপাঠ্য। যারা মূল মহাভারতের বিশাল কাহিনী পড়তে চান কিন্তু তার বিস্তৃতি ও জটিলতায় দ্বিধায় থাকেন, তাদের জন্য এই উপন্যাস একটি সংক্ষিপ্ত ও ধারাবাহিক পাঠের সুযোগ তৈরি করে। উপন্যাসটিতে কাহিনীর ধারাবাহিকতাকে প্রাধান্য দেয়ায় মহাভারতের বিস্তৃত দার্শনিক আলোচনা বা গভীরতা এখানে তুলনামূলক কম।