‘উপমহাদেশে বীমাশিল্পের পটভূমি ও আমাদের বর্তমান’

ইতিহাসের পরতে পরতে নানা গল্প জড়িয়ে থাকে। সব গল্প আমাদের জানা হয় না। এটা মানুষ হিসেবে আমাদের এক ধরনের সীমাবদ্ধতা বলা যায়। দৃষ্টিশক্তির সামর্থ্যের বাইরে যেমন দৃশ্য দেখা যায় না, তেমনি যা দেখতে চাই না, সেটিও দেখতে পাই না। কিংবা সেভাবে উপলব্ধি করা হয় না। এই যেমন বীমাশিল্প। তৎকালীন ভারতে ‘ব্রিটিশ হটাও’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ইংরেজ বিধবাদের সুরক্ষায় অনেকটা অগোছালোভাবে হলেও ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম চালু হয় ‘ওরিয়েন্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি’, যা ১৮১৮ সালে জীবন বীমা কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের মুক্তির লড়ায়ইয়ের গল্প অনেক পড়া হয়েছে, চায়ের আড্ডায় সেসব গল্প শোনা হয়েছে কিন্তু কখনই বীমার গল্পটা জানা হয়নি কিংবা জানতেই চাওয়া হয়নি। শুরুতে সেটাই বলছিলাম, সব গল্প আমাদের জানা হয় না। ঘটনাক্রমে ‘উপমহাদেশে বীমাশিল্পের পটভূমি ও আমাদের বর্তমান’ বইটি হাতে আসায় এই গল্পের সঙ্গে পরিচয় ঘটলো। তবে আগ্রহ ছাড়া কোনোকিছু কি জানা যায়! যায় না। সেক্ষেত্রে সাধুবাদ দিতে হয় বইটির প্রকাশককে। মূলত ফ্ল্যাপের লেখাটি পড়ে বইটির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া—

“সারা পৃথিবীতে বীমাশিল্পকে চিহ্নায়িত করা হয় নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে— কিন্তু আমাদের দেশে এসে তা পরিণত হয়েছে অনিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে। এই বঙ্গ দেশে সাধু আসলেও ভুলে যায় শাস্ত্রের কথা...”

আর পুরো বইয়ে মন নিবিষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার অবশ্যই বইটির লেখক- ‘আহমদ ফারুক’। তাছাড়া নিজস্ব পেশাগত কারণে এ শিল্পের প্রতি কিছুটা আগ্রহ আমার আগে থেকেই জন্মেছিল। অনেকটা দুয়ে দুয়ে চার হবার মতো একটা বিষয় দাঁড়ালো। এদিকে লেখকের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং বীমাশিল্পের উন্নয়ন চেষ্টায় তার একনিষ্ঠতা বেশ স্পষ্ট বইয়ের প্রতিটা পাতায়। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে বইটির সাবলীল ভাষা। বীমা শব্দটি শুনলেই সাধারণের মনে এক ধরনের জটিলতাজনিত যে ভীতি জন্মায়, বইটি সে তুলনায় অনেকটা সহজ শব্দে লেখা। একদমে পড়ে শেষ করা যায়। তাই যারা সহজভাবে বীমাশিল্পের ইতিহাস ও বর্তমান জানতে চান, আশা করা যায় তাদের কাছে বইটি ‘সুখপাঠ্য’ হিসেবে বিবেচিত হবে। আবার দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে বীমা খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যত কেমন হতে পারে তার পেতেও বইটি পড়া যায়। বইটিতে উপমহাদেশের বীমা ব্যক্তিত্ব ও চিন্তকদের কথাও উঠে এসেছে। শুরুতেই এসেছে সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের নাম। এ তালিকায় রয়েছেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহাকবি আল্লামা ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পিতা স্যার আবদুল্লাহ আল-মামুন সোহরাওয়ার্দীর নাম।

বইটি প্রকাশ করেছে জাগতিক প্রকাশন। এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। মুদ্রিত মূল্য ৪০০ টাকা।

বীমার ধারণা মানব সভ্যতার প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান। মানব জীবনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দলগত সুরক্ষা ব্যবস্থা বীমার আদিম রূপ। তবে আধুনিক বীমাশিল্পের সূচনা ঘটে ব্রিটিশ উপনিবেশকালে। ১৮১৮ সালে বোম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম জীবন বীমা কোম্পানি, ‘ওরিয়েন্টাল লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি’, যা মূলত ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য কাজ করত। এর ৩২ বছর পর ১৮৫০ সালে কলকাতায় ‘ট্রাইটন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি’ নামে প্রথম নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি হিসেবে উপমহাদেশে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীকালে ভারতীয়দের অংশগ্রহণে বীমা খাতের সম্প্রসারণ ঘটে। ১৯১২ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রথমবারের মতো বীমা আইন প্রণয়ন করে, যা এই শিল্পের কাঠামোগত ভিত্তি স্থাপনে সহায়ক হয়ে ওঠে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ বীমাশিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। ভারত ও পাকিস্তানে বীমা খাত স্বতন্ত্র্য হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে বীমাশিল্প ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে, যদিও তা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ৪৯ টি বীমা কোম্পানি কার্যকর ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে সেসব কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে দুটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান- সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশন প্রতিষ্ঠা পায়। সরকারের পাশাপাশি ১৯৮৫ সালে বেসরকারি খাতে বীমা কোম্পানি চালুর অনুমোদন দেয়া হলে শিল্পটি ক্রমান্বয়ে এদেশে প্রসার লাভ করে।

উপমাহদেশ থেকে বাংলাদেশে বীমা শিল্পের বিকাশের গল্প এভাবে অনকেগুলো ভাগে বিস্তারিত আলাপ করেছেন লেখক। তবে ‘ভারত বিভক্তি: স্বাধীন বাংলাদেশ ও বীমা খাত শিল্প’ অধ্যায়ে লেখন বাংলাদেশের বীমা খাতের ব্যক্তিদের তুলে ধরার প্রয়াস যে করেছেন তা আরো নির্মোহভাবে প্রকাশ করা গেলে বেশি উপভোগ্য হতো বলে মনে হয়। এখানে লেখক নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকের নাম যেমন এম শামসুল আলম, নাসির এ চৌধুরী, এ কে এম রফিকুল ইসলামসহ আরো অনেকের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি নেতিবাচক কিছু নয়, যে কারণে আগেও উল্লেখ করা হয়েছে লেখকের পেশাগত অভিজ্ঞতা বেশ স্পষ্ট এই বইয়ে। কিন্তু অধ্যায়টিতে তাদের অবদানগুলো অনেকটাই গড়পতাভাবে এসেছে। তাদের কাজগুলো আরো কিছুটা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা গেলে তা পাঠক মনের জিজ্ঞসা দূর করতে সহায়ক হতো, যার অনেকটাই উপমহাদেশের বীমা ব্যক্তিদের বর্ণনায় এসেছে। কিংবা বইয়ের শিরোনামে সেক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারত ‘আমার চোখে দেখা’ টাইপ কোনো শব্দগুচ্ছ। আবার বইটির প্রকাশকাল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। সবাই কমবেশি জানে এ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় সব খাতে নানা পরিবর্তন এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই বীমা খাতের পরিবর্তন নিয়েও মনে প্রশ্ন জাগে। সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ থাকলে বাংলাদেশের বীমা খাতের বর্তমান চিত্রের পুরোটা ফুটিয়ে তোলা যেত। হতে পারে বইটি প্রকাশের কাজ অনেক আগে শুরু হয়েছে, তবে অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বীমা শিল্পের বর্ণনা থাকলে বইটি বর্তমানে সঙ্গে আরো প্রাসঙ্গিক হতে পারত। আশাকরি পরবর্তী সময়ে কোনো সংস্করণ এলে এ ঘাটতিগুলোর অনেকেটাই পুষিয়ে দেয়া হবে। এটুকু ছাড়া পুরো বইটি, আবারো বলতে হচ্ছে, সহজ-সাবলীল এবং তথ্যবহুল।

আরও