হারিয়ে যাওয়া আলোর উৎস: কুপি বাতি, হারিকেন ও হ্যাজাক

কুপি-হারিকেনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের পড়াশোনার স্মৃতিও। সন্ধ্যা নামলেই মাদুর পেতে কুপির আলোয় বই নিয়ে বসত শিক্ষার্থীরা। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী আলোর ব্যবস্থাতেও ছিল পার্থক্য। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারে হারিকেন, আর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকের ভরসা ছিল কুপিবাতি

একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠি, সামান্য কেরোসিন আর কাপড়ের পেঁচানো সলতে—এই ছিল একসময় রাতের আলো জ্বালানোর আয়োজন। সলতেতে আগুন ধরলেই টিনের কুপিতে জ্বলে উঠত ছোট্ট শিখা। কাচের চিমনির ভেতর হারিকেনের আলো একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে। আর বড় কোনো আয়োজন হলে রাতের অন্ধকার দূর করতে জ্বালানো হতো হ্যাজাক। সে আলো এখন আর ঘরে ঘরে জ্বলে না। তবে লোডশেডিংয়ে হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলে মনে পড়ে যায় পুরনো আলোর কথা। যে সময়ে রাতের অন্ধকার ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ, আর আলো ছিল যত্ন করে জ্বালিয়ে রাখার বিষয়।

একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই দেখা যেত কুপি কিংবা হারিকেন। কুপি ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ আলোর ব্যবস্থা। টিনের তৈরি ছোট পাত্রে কেরোসিন রাখা হতো। তাতে কাপড় পেঁচিয়ে তৈরি সলতে বসানো হতো। সলতে কেরোসিন শুষে নিত, আর তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেই জ্বলে উঠত আলো। কোথাও কোথাও ওষুধের কাচের শিশি দিয়েও ঘরে তৈরি করা হতো কুপিবাতি। আবার পিতল বা ধাতুর তৈরি কুপিরও ছিল আলাদা কদর। বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এসব কুপি উপহার দেয়ার চলও ছিল।

হারিকেন ছিল কুপির তুলনায় কিছুটা উন্নত আলোর ব্যবস্থা। নিচের অংশে থাকত কেরোসিনের ট্যাংক, তার ওপরে সলতে ও কাচের চিমনি। ধাতব কাঠামো দিয়ে ঘেরা থাকায় বাতাসের প্রবাহে আলো সহজে নিভে যেত না। হারিকেনের নিচে থাকা চাকতি ঘুরিয়ে সলতে ওপরে-নিচে করা হতো। এর সঙ্গে কমত-বাড়ত আলোর তীব্রতাও। ফলে ঘরের কাজ, রান্নাবান্না কিংবা পড়াশোনার জন্য হারিকেন ছিল বেশ কার্যকর।

শুধু ঘরেই নয়, রাতের পথচলারও সঙ্গী ছিল হারিকেন। গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, পালকি, টমটম কিংবা রিকশায় ব্যবহার করা হতো এটি। হাট-বাজারে যাওয়ার সময় অনেকে সঙ্গে রাখতেন কুপি বা হারিকেন। দোকানিরাও লালবাতি কিংবা খুটিবাতি জ্বালিয়ে রাতের বেচাকেনা চালাতেন।

তবে বড় পরিসরে আলো দরকার হলে ভরসা ছিল হ্যাজাক লাইট। কুপি কিংবা হারিকেনের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল আলো দিতে পারত এটি। বিয়ে, মেলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা কিংবা গ্রামের বড় কোনো আয়োজনে রাতের অন্ধকার কাটাতে হ্যাজাকের ব্যবহার ছিল বেশি। ফলে এটি শুধু আলোর উৎস ছিল না, গ্রামীণ সামাজিক জীবনেরও একটি পরিচিত অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল।

কুপি-হারিকেনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের পড়াশোনার স্মৃতিও। সন্ধ্যা নামলেই মাদুর পেতে কুপির আলোয় বই নিয়ে বসত শিক্ষার্থীরা। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী আলোর ব্যবস্থাতেও ছিল পার্থক্য। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারে হারিকেন, আর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকের ভরসা ছিল কুপিবাতি। সেই মৃদু আলোয় পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন বহু মানুষ।

সময় বদলেছে। বদলে গেছে আলোর প্রয়োজন, অভ্যাস ও জীবনযাপন। বিদ্যুৎ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। কুপি-হারিকেনের জায়গা নিয়েছে এলইডি বাতি, রিচার্জেবল লাইট, আইপিএস ও সোলার প্যানেল। রাতের অন্ধকার এখন আর আগের মতো জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা নয়।

আজ সে আলো প্রয়োজনের চেয়েও বেশি স্মৃতি। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে, সে স্মৃতিই অন্ধকার ঘরে একটু আলো জ্বেলে দেয়। চার্জার লাইটের ব্যাটারি যখন ফুরিয়ে আসে, মোবাইলের চার্জও যখন শেষের পথে, তখন কোথাও কোথাও কুপি-হারিকেনই হয়ে ওঠে জরুরি বিকল্প। বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট ও লোডশেডিংয়ের সময়ে গ্রামীণ বাজারে এসব পুরোনো আলোর উৎসের চাহিদা বাড়ার কথাও শোনা যায়। একসময় যে কুপি-হারিকেন আধুনিকতার কাছে হারিয়ে গিয়েছিল, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে তার প্রয়োজন যেন আবারও সামান্য ফিরে এসেছে।

তবে প্রয়োজনের এ সাময়িক প্রত্যাবর্তন আর আগের জীবন ব্যবস্থা এক নয়। কারণ কুপি-হারিকেনের সঙ্গে শুধু আলো নয়, জড়িয়ে ছিল একটি নির্দিষ্ট জীবনযাপন। দিন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ গুটিয়ে নিত মানুষ, রাত ছিল বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ। সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যরা এক জায়গায় বসত, গল্প করত, পড়াশোনা করত। রাত ছিল অপেক্ষাকৃত ধীর, শান্ত ও পারিবারিক।

নগরায়ন ও প্রযুক্তির বিস্তারে সেই ছন্দও বদলে গেছে। বিদ্যুৎ, সোলার প্যানেল, আইপিএস ও ব্যাটারিচালিত বাতির কারণে রাতেও দিনের মতো কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে দিন ও রাতের ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে। মানুষের কাজের সময় যেমন বেড়েছে, তেমনি বদলেছে ঘুম ও বিশ্রামের অভ্যাসও।

আরও