নগরে নিঃসঙ্গ নবাব

নগরের নিঃসঙ্গ আলোয় ঘর পালানো যুবকের নবাব হয়ে ওঠার গল্প

সম্পদ অনেক সময় প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই সংশয়ের কারণেই প্রাচুর্য ছেড়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে এক তরুণ এসে পড়ল এই রাজধানীর জনারণ্যে। কী করবে, কোথায় যাবে—কিছুই জানে না। খিদে, ক্লান্তি আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় একসময় ফুটওভার ব্রিজের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে সে। জেগে উঠে দেখে, মাথার নিচে রাখা ব্যাগটি নেই। হারিয়ে গেছে পরিচিতজনদের ঠিকানাও। শহর তখন তার কাছে হয়ে ওঠে আরো বেশি নিষ্ঠুর, আরো বেশি অচেনা।

তার জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকৃতিও যেন প্রচণ্ড ঝড় নামায় সে রাতে। পুরান ঢাকার একটি বাকরখানির দোকানের সামনে কুকরকে জড়িয়ে ধরে ডানাভাঙা পাখির মতো ঘুমিয়ে পড়ে সে। ভোর হলে দোকানের মালিক বা অন্য কোন কর্মচারীই তাকে জায়গা দিতে রাজি হয় না। তবে মালিকের বন্ধুর উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত সেই বাকরখানির দোকানে জায়গা হয় ছেলেটির। সেখানেই কাজ, সেখানেই আশ্রয়। আর তিনিই নতুন করে যুবকের নাম রাখেন—‘নবাব’। নামের ভেতর যেন এক অদৃশ্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত।

এ সূচনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ‘নগরে নিঃসঙ্গ নবাব’-এর মর্ম। গ্রাম থেকে বিতাড়িত, ভাগ্যের নির্মমতায় নগরে এসে পড়া এক যুবকের ধীরে ধীরে টিকে ওঠার গল্প এটি। কিছু অচেনা মানুষের মমতা, সামান্য আশ্রয় আর নিজের পরিশ্রম—এই তিনের সমন্বয়ে নবাব একসময় নগরের বুকে নিজের জায়গা করে নেয়। বাকরখানির দোকানে কাজ করতে করতেই সে সেই ঐতিহ্যবাহী খাবারকে পৌঁছে দেয় দেশের নানা প্রান্তে।

লেখক গিয়াস আহমেদ তার ‘নগরে নিঃসঙ্গ নবাব’ উপন্যাসে শহুরে নিষ্ঠুরতার কঠিন বাস্তবতা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি দেখিয়েছেন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মমতার আলোও। পুরান ঢাকার অলিগলি, মানুষের ভাষা, চলনবলন—সবকিছু এত জীবন্ত হয়ে উঠেছে যে পাঠক যেন গল্পের ভেতর দিয়েই হেঁটে বেড়ান। বিশেষ করে বাকরখানির দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনচিত্র উপন্যাসটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।

উপন্যাসের অন্যতম শক্তি এর ইতিহাসচর্চা। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাকরখানির উৎপত্তি, বিবর্তন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট গল্পের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে তা কখনোই আলাদা করে বোঝা যায় না—বরং পাঠক অনায়াসে ইতিহাসের ভেতর ঢুকে পড়েন। বাকরখানি কেবল আর খাবার তাকে না; হয়ে ওঠে সংস্কৃতি, স্মৃতি আর সময়ের ধারাবাহিকতার প্রতীক।

উপন্যাসের আরেকটি বড় আকর্ষণ লেখকের ভাষা। তার লেখা যেন হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মধুর—সহজ, কোমল, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী। শব্দচয়ন ও বাক্য গঠনের মুন্সিয়ানা অনেক ক্ষেত্রেই কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার প্রয়োজনে সেই ভাষাই হয়ে ওঠে দৃঢ়, তীক্ষ্ণ। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই পাঠককে গল্পের ভেতর টেনে রাখে।

নগর জীবনের একেবারে নৈমিত্তিক একটি ঘটনাকে লেখক যে গভীরতা, দরদ এবং ইতিহাসের আলোয় উপস্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বোঝার এমন গুরুত্বপূর্ণ পাঠ স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন।

মাঝেমধ্যে সংযোজিত গানগুলো উপন্যাসের আবহকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। এগুলো কেবল অলংকার নয়, বরং চরিত্রের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সম্প্রসারণ।

‘নগরে নিঃসঙ্গ নবাব’ একটি বহুমাত্রিক উপন্যাস—ব্যক্তি জীবনের সংগ্রাম, নগর বাস্তবতা, ইতিহাস ও মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে। তবে গল্পের যে কাঠামো তাতে পাঠক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে আরেকটু সম্প্রসারণ প্রয়োজন ছিল। পড়তে পড়তে কিছুটা অতৃপ্তি রয়ে গেছে, গল্পকে গুটিয়ে নেয়ার তাড়া নজরে পড়েছে। মনে হয়েছে, অনুপ্রেরণার এ গল্প পাঠক হিসেবে আমাকে ভাসিয়ে রাখলেও ভেজাতে পারল না।

আরও