ডেডলাইন ঘনিয়ে এসেছে, জরুরি কাজটি শেষ করতে হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। এমন সময় পাশের ডেস্কে সহকর্মীর উচ্চস্বরে হাসি কিংবা মুঠোফোনে অনর্গল কথা বলে যাওয়ায় আপনার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটালে কেমন লাগবে? কর্মক্ষেত্রে এমন ছোটখাটো অভ্যাসই কখনো কখনো অন্যের অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।
শুধু উচ্চস্বরে কথা কিংবা হাসিই যে এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, বিষয়টি এমন না। প্রতিদিনের জীবনের খুবই ছোট-খাটো পদক্ষেপ, যেমন কারো গহনা বা জুতার শব্দ, অগোছালো ডেস্ক কিংবা অপরিষ্কার পানির বোতলও সহকর্মীদের বিরক্তির কারণ হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে ভিন্ন স্বভাব, পরিবেশ, পছন্দ ও অভ্যাসের মানুষের একসঙ্গে কাজ করতে হয়। তাই নিজের কাছে স্বাভাবিক মনে হওয়া প্রতিটি আচরণ অন্যের কাছেও স্বস্তিদায়ক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিগত পছন্দের চর্চা করতে গিয়ে আমরা অজান্তেই অন্যের বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছি না তো? স্বাধীনতা মানে কি যা খুশি তাই করা?
ব্যাক্তি স্বাধীনতার আভিধানিক সংজ্ঞা হলো, এটি এমন একটি মৌলিক অধিকার যেখানে একজন মানুষ অন্য কারো অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চিন্তা করা, মতামত প্রকাশ করা, চলাফেরা করা এবং জীবন ও পছন্দ নির্ধারণের সুযোগ পায়। তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তিটির কিছু দায়বদ্ধতাও থাকে। ব্যক্তি স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা করা কিংবা অন্যের ক্ষতি করার লাইসেন্স নয়। এর কিছু নির্দিষ্ট আইনি ও সামাজিক সীমানা রয়েছে।
কর্মক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। কেউ কী পোশাক পরবেন, কেমন গহনা নির্বাচন করবেন কিংবা নিজের ডেস্ক কীভাবে সাজাবেন, তা অনেকাংশেই তার ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু সেই পছন্দের চর্চা যদি আশপাশের মানুষের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়, যৌথ জায়গা ব্যবহারে সমস্যা তৈরি করে কিংবা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে, তখন বিষয়টি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না।
যদিও অন্যের সামান্য বিরক্তি আর প্রকৃত ক্ষতি এক বিষয় নয়। কারো কোনো অভ্যাস অপছন্দ হলেই সেটিকে ভুল বলা যায় না। দেখতে হবে, আচরণটি সত্যিই অন্যের কাজ, অধিকার বা স্বস্তিতে কতটা প্রভাব ফেলছে। ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দেয়াই এখানে মূল কথা।
ছোট অভ্যাসে প্রকট বিরক্তি
কর্মক্ষেত্রে অস্বস্তির কারণ হতে সব সময় বড় কোনো ঘটনার প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসও ধীরে ধীরে বিরক্তি তৈরি করতে পারে।
১. নিজের অজান্তেই শব্দের উৎস হয়ে ওঠা
কেউ হয়তো হাতে চুড়ি কিংবা পায়ে নূপুর পরতে ভালোবাসেন। এটি একান্তই তার ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু গহনার শব্দ যদি কাজের সময় বারবার আশপাশের মানুষের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একইভাবে শব্দ করে জোরে হাঁটা, ডেস্কের ওপর শব্দ করে জিনিসপত্র রাখা কিংবা কিবোর্ডে প্রচণ্ড জোরে টাইপ করাও অন্যের বিরক্তির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে যদি কেউ অসুস্থ বা ক্লান্ত থাকেন তখন সামান্য অতিরিক্ত আওয়াজ সহ্য করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এক্ষেত্রে নিজের পছন্দ পুরোপুরি বাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কোথায়, কখন এবং কীভাবে সেই পছন্দের চর্চা করা হচ্ছে, তা খেয়াল রাখা জরুরি। বিশেষ করে মনোযোগ দিয়ে কাজ করার পরিবেশে অপ্রয়োজনীয় শব্দ কমিয়ে আনা সহকর্মীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
২. কথা ও হাসির শব্দে অফিস মুখর করে রাখা
সহকর্মীদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা কর্মক্ষেত্রের স্বাভাবিক অংশ। এতে সম্পর্ক ভালো থাকে, কাজের একঘেয়েমিও কাটে। কিন্তু কথা বলা, হাসা কিংবা ফোনে আলাপের শব্দ যখন অন্যদের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়, তখন তা সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে কেউ যখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, অনলাইন মিটিংয়ে আছেন কিংবা ফোনে জরুরি আলোচনা করছেন, তখন আশপাশের অতিরিক্ত শব্দ তার জন্য বাড়তি অসুবিধা তৈরি করে। তাই নিজের স্বাভাবিক কথাবার্তার ধরন বজায় রাখার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।
৩. নিজের ডেস্ক ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের পরিচ্ছন্নতা
কারো ডেস্কে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খাবারের প্যাকেট, ব্যবহৃত কাপ কিংবা অন্যান্য জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। নিজের ডেস্ক কতটা গোছানো থাকবে, সেটি ব্যক্তিগত পছন্দ বলে মনে হতে পারে। তবে খাবারের উচ্ছিষ্ট, দুর্গন্ধ কিংবা অপরিষ্কার পানির বোতল বা অন্যান্য জিনিসপত্রের কারণে আশপাশের পরিবেশে সমস্যা তৈরি হলে তা আর শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। নিজের ব্যবহারের জিনিস পরিষ্কার রাখা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অংশ। আর সেগুলো যদি যৌথ ব্যবহারের জায়গায় রাখা হয়, তাহলে অন্যদের স্বস্তি ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
৪. সুগন্ধি ব্যবহারেও চাই ভারসাম্য
কেউ পছন্দের সুগন্ধি ব্যবহার করতে ভালোবাসেন, আবার কেউ কেউ ঘ্রাণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। তবে সুগন্ধির তীব্র ঘ্রাণ কখনো কখনো অন্যদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। একইভাবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব থেকেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কাউকে বিব্রত করা বা তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করার পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জরুরি। নিজের পছন্দের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের স্বস্তির কথাও ভাবতে হবে।
৫. অন্যের ব্যক্তিগত পরিসর বুঝতে না পারা
কাজের ফাঁকে সহকর্মীর ডেস্কে গিয়ে দাঁড়ানো, অনুমতি ছাড়াই তার জিনিসপত্র ব্যবহার করা, বারবার ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা কিংবা কাজের সময় অপ্রয়োজনে কথা বলতে থাকা—এসব আচরণও বিরক্তির কারণ হতে পারে।
একজন হয়তো সহজেই সবার সঙ্গে মিশতে পছন্দ করেন, কিন্তু অন্যজন নিজের কাজে মনোযোগ দিতে বা কিছুটা ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখতে চাইতে পারেন। তাই নিজের সামাজিক হওয়ার ধরন অন্যের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তার স্বাচ্ছন্দ্য ও সীমারেখাকে সম্মান করা প্রয়োজন।
বিরক্ত হলেও মুখ ফুটে বলা যায় না কেন?
কোনো সহকর্মীর আচরণ অপছন্দ হলেই তাকে তা জানিয়ে দেয়া সহজ নয়। কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজ করাই নয়, সম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মীকে কিছু বললে তিনি কষ্ট পেতে পারেন, ভুল বুঝতে পারেন কিংবা পরবর্তী সময়ে সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা অনেকের মধ্যে কাজ করে।
আবার নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়েও কেউ কেউ সন্দিহান থাকেন। তারা ভাবেন, ‘আমি কি একটু বেশিই সংবেদনশীল হয়ে পড়ছি?’ কিংবা ‘অন্যরা তো কিছু বলছেন না, তাহলে আমারই সমস্যা হচ্ছে কেন?’
ফলে বিরক্তি প্রকাশ না করে অনেকে নীরব থাকেন। কিন্তু একই আচরণ প্রতিদিন ঘটতে থাকলে সেই বিরক্তি জমতে পারে। একসময় ছোট কোনো ঘটনাতেও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ে।
যদিও কোনো কাজে কিছু মানুষ বিরক্ত হলেই সেটি যে সবার কাছে বিরক্তিকর হবে, তা নয়। প্রতিটি মানুষের শব্দ সহ্য করার ক্ষমতা, পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস, ব্যক্তিগত পরিসরের চাহিদা ও কাজের ধরন আলাদা হতে পারে। তাই নিজের অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি অন্যের আচরণকে বিচার করার ক্ষেত্রেও সংযত থাকা প্রয়োজন।
নিজের অভ্যাস অন্যের কাছে কেমন, বুঝবেন কীভাবে?
এ ক্ষেত্রে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে। আমার আচরণ কি অন্যের কাজে বাধা দিচ্ছে? আমার ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে কি যৌথ ব্যবহারের জায়গাটি নোংরা হচ্ছে? আমার অভ্যাসে কেউ অস্বস্তি বোধ করলেও সম্পর্কের কথা ভেবে কিছু বলছেন না কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অর্থ নিজের ব্যক্তিত্ব বদলে ফেলা নয়। বরং নিজের অজান্তে অন্যের অসুবিধা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া।
একই সঙ্গে অন্যের আচরণ নিয়ে বিরক্ত হলে সেটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা-ও ভেবে দেখা দরকার। সামান্য কোনো শব্দ ক্ষণিকের জন্য বিরক্ত করতে পারে, কিন্তু সে জন্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা বা তার পছন্দ নিয়ে কটাক্ষ করা সমস্যার সমাধান নয়।
সম্পর্ক নষ্ট না করে বিরক্তি প্রকাশ করবেন কীভাবে?
কোনো সহকর্মীর অভ্যাস সত্যিই কাজে ব্যাঘাত ঘটালে বিষয়টি চেপে রাখার পরিবর্তে ভদ্রভাবে জানানো যেতে পারে। তবে কীভাবে কথাটি বলা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন, ‘আপনি সব সময় এত জোরে কথা বলেন কেন?’—এভাবে বললে অন্য ব্যক্তি নিজেকে অভিযুক্ত মনে করতে পারেন। এর বদলে বলা যায়, ‘আমি যখন কাজে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করি, তখন একটু কম শব্দ হলে আমার সুবিধা হয়।’
অর্থাৎ, ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে আচরণটির প্রভাব বোঝানো ভালো। প্রয়োজনে একান্তে কথা বলা যেতে পারে, যাতে অন্য সহকর্মীদের সামনে তিনি বিব্রত না হন।
অন্যদিকে, নিজের অভ্যাস নিয়ে কেউ অভিযোগ করলে তা নিয়ে রাগ বা অভিমান না করে তার কথাটিও শোনা জরুরি। নিজের কাছে বিষয়টি তুচ্ছ মনে হলেও অন্যের কাজের ক্ষেত্রে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আবার অভিযোগটি যৌক্তিক না মনে হলে শান্তভাবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও জানানো যায়।
নিজের মতো থাকা, অন্যের স্বস্তির কথাও ভাবা
কর্মক্ষেত্রে সবাই একই রকম হবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে যখন অন্যের কাজে নিয়মিত ব্যাঘাত ঘটে, যৌথ জায়গা ব্যবহারে অসুবিধা হয় কিংবা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়, তখন নিজের আচরণ নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। একইভাবে অন্যের ছোটখাটো অভ্যাসে বিরক্ত হলে সেটিকে বড় দ্বন্দ্বে পরিণত না করে আলোচনার সুযোগ রাখা উচিত।