শিশুর পাতে সবজি তুলতে যুদ্ধ নয়, দরকার ছোট ছোট অভ্যাস

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্যারেন্টিং গ্রুপগুলোয় এমন প্রশ্ন নিয়মিতই দেখা যায়, আমার সন্তান শুধু একরঙা খাবার খেতে চায়, এটা কি স্বাভাবিক?

শিশুর খাবারের পছন্দ তৈরি হতে খাকে জন্মেরও আগে। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় মা যেসব খাবার খান, তার প্রভাব অ্যামনিওটিক তরলের মাধ্যমে ভ্রূণের ওপরও পড়ে এবং তা পরবর্তী সময়ে শিশুর খাবারের পছন্দ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে

প্যারেন্টিং ফোরাম কিংবা মা-বাবাদের আড্ডায় একটি হাহাকার মোটামুটি চিরন্তনই। তাদের বলতে শোনা যায়, ‘আমার বাচ্চা কেন শুধু সাদা বা হালকা রঙের খাবার খেতে চায়? গাজর কিংবা সবুজ সবজি দেখলেই কেন পালিয়ে যায়?’ শিশুদের শাকসবজি খাওয়ানো সত্যিই এক মস্ত বড় যুদ্ধ। বিবর্তনগতভাবেই মানুষের মিষ্টি স্বাদের প্রতি দুর্বলতা জন্ম থেকে। এমনকি মায়ের বুকের দুধেও প্রাকৃতিক শর্করা থাকে, এ কারণে শিশুরা মিষ্টি স্বাদ বেশি পছন্দ করে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি অস্বাভাবিক নয়। বরং শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেরই একটি অংশ। তবে ছোটবেলা থেকেই কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে সেই শিশুই বড় হয়ে সবজি খেতে অভ্যস্ত হতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় এমনই কিছু কার্যকর কৌশলের কথা উঠে এসেছে।

শুরুটা যত তাড়াতাড়ি, ততই ভালো

শিশুর খাবারের পছন্দ তৈরি হতে থাকে জন্মেরও আগে। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় মা যেসব খাবার খান, তার প্রভাব অ্যামনিওটিক তরলের মাধ্যমে ভ্রূণের ওপরও পড়ে এবং তা পরবর্তী সময়ে শিশুর খাবারের পছন্দ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যারিয়ন হিদারিংটন বলেছেন, সবজির সঙ্গে পরিচয় যত আগে শুরু হবে, তত ভালো। বিশেষ করে পাঁচ বছর বয়সের আগেই শিশু যদি নিয়মিত নানা ধরনের সবজি দেখে, ছোঁয় এবং খায়, তাহলে ভবিষ্যতে সেগুলো গ্রহণ করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

শিশুদের রান্নায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিলে নতুন ও অপরিচিত খাবার খাওয়ার প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ে

অবশ্য প্রথমবারেই কোনো শিশু ব্রকলি বা পালং শাক ভালোবেসে ফেলবে এমনটা আশা করা উচিৎ নয়। কোনো কোনো শিশুকে একই সবজি পাঁচবার দেখাতে হয়, আবার কারো ক্ষেত্রে ১০-১৫ বারও লাগতে পারে। এরপর হয়তো সেটি তাদের কাছে সেটি তাদের কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

খাবারের শুরুতেই থাকুক সবজি

আমরা সাধারণত শিশুদের বলি, সবজি খেলে শক্তি হবে। কিন্তু শিশুরা ‘স্বাস্থ্যকর’ খাবারের চেয়ে ‘সুস্বাদু’ খাবার বেছে নিতে পছন্দ করে। তাই কৌশল বদলাতে হবে।

বেশির ভাগ পরিবারে সবজি থাকে খাবারের শেষে। কিন্তু তখন পর্যন্ত শিশুর পেট অনেকটাই ভরে যায়।

গবেষকরা বলছেন, শিশু সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকে খাবারের শুরুতে। তাই সেই সময় সবজি পরিবেশন করলে তা খাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়ে। এতে শুধু সবজি খাওয়াই বাড়ে না, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবারও তুলনামূলক কম খাওয়া হয়।

অন্য সব খাবারের আগে শিশুকে সবজি দিলে তা খাওয়ার প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়

অনেকে মনে করেন সকালের নাশতায় সবজি মানায় না। কিন্তু শিশুর পেটে সবজি দিতে চাইলে রেগুলার নাশতার সঙ্গে একটু কৌশল খাটাতে হবে। সকালের ডিমের অমলেটে সামান্য পালং শাক কুচি ও মাশরুম মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে। আর লাউ কিংবা আমাদের দেশের বাজারে এখন সহজেই পাওয়া যাওয়া জুচিনি (চিচিঙ্গা বা ধুধুলের মতো এক ধরনের সবজি) কুচি করে কেক বা মাফিনের মতো বানিয়ে দিলে শিশুরা বেশ আগ্রহ নিয়েই খাবে বলে আশা করা যায়।

যুক্তরাজ্যের ৮টি চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের নাশতায় যখনই শিশুদের সবজি পরিবেশন করা হয়েছে, ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রেই তারা তা খেয়েছে।

প্লেটের অনুপাত বদলালেই বদলাতে পারে অভ্যাস

সকালের নাশতায় আলাদা করে সবজি খাওয়ানো কঠিন মনে হলে চিন্তার কিছু নেই। রান্নার ধরণেই ছোট্ট পরিবর্তন আনা যেতে পারে। বেশি ক্যালরিযুক্ত উপাদান কিছুটা কমিয়ে তার জায়গায় সবজির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। নুডলস, পাস্তা বা বিভিন্ন সসে গাজর, লাউ বা অন্য সবজি কুচি করে মিশিয়ে দেয়া যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর থালায় ফল ও সবজির পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিলে তারা স্বাভাবিকভাবেই আগের চেয়ে বেশি সবজি খেয়ে ফেলে।

খাবারের চেহারা বদলে দেয়া

খাবারের স্বাদ মুখে পৌঁছানোর আগেই তার বিচার শুরু হয় চোখে। শিশুরা সবসময় পরিচিত আর দেখতে সুন্দর খাবারের দিকেই আগে হাত বাড়ায়। প্রজাপতি, ফুল বা টেডি বিয়ারের আকৃতিতে কাটা ফল ও সবজি শিশুদের বেশি আকৃষ্ট করে।

একটি প্লেটে ছোট ছোট ভাগ করে বিভিন্ন সবজি সাজিয়ে রাখলেও শিশুরা সেগুলো বেশি বেছে নেয়। আবার প্লেটে আলাদা আলাদা অংশে খাবার সাজিয়ে দিলে প্রাক-প্রাথমিক বয়সী শিশুরা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি সবজি খেয়েছে বলেও গবেষণায় দেখা গেছে।

পরিবারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়া

শিশুরা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে দেখে। যদি বাবা-মা নিয়মিত সবজি, ফল খান এবং পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খান, তাহলে শিশুও ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে সেই অভ্যাস গড়ে তোলে।

নিউজিল্যান্ডে স্কুলশিশুদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস রয়েছে, সেসব পরিবারের শিশুরা কেক, চকলেট ও অস্বাস্থ্যকর নাশতা তুলনামূলক কম খায়।

তাই সপ্তাহে অন্তত তিন দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্বাভাবিক ওজন ও ভালো শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

সবজিকে যুদ্ধ নয়, রুটিন খাবারে পরিণত করুন

অনেক বাবা-মা জোর করে সবজি খাওয়াতে চান। কেউ আবার সবজি খেলে পুরস্কার হিসেবে চকোলেট বা মিষ্টি দেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি পদ্ধতিই উল্টো ফল দিতে পারে। এতে শিশুর কাছে সবজি বিরক্তিকর আর মিষ্টি আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বরং শিশুকে খাবার নিয়ে খেলতে দিন। বিট, ছোলা বা বিভিন্ন সবজি হাতে ধরতে, গন্ধ নিতে কিংবা ভালো করে দেখতে দিন। প্রথম দিন খেতেই হবে শিশুকে এমন কোনো চাপ দেয়া উচিৎ না।

গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে ধীরে ধীরে পরিচয় করিয়ে দিলে নতুন খাবারের ভয় কমে যায় এবং পরে শিশুরা সেগুলো খেতে আগ্রহী হয়। রান্নার কাজে অংশ নিতে দিলে সেই আগ্রহ আরো বাড়ে।

গবেষক ও রন্ধনশিল্পী জোসেফ ইউসেফ জানান, শিশুদের কাছে খাবারকে খেলায় পরিণত করা গেলে তারা কোনো চাপ ছাড়াই নতুন স্বাদ গ্রহণ করতে শেখে।

শেষ পর্যন্ত সবজির সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে একদিন নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসে। সেই অভ্যাস যদি আনন্দের হয়, তবে একসময় ব্রকলি বা পালং শাকও তার কাছে আলাদা কোনো ‘শাস্তির খাবার’ নয়, বরং স্বাভাবিক খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও