অ্যানিমেল ফার্ম: প্রকাশের ৮০ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক যে কল্পকাহিনী

অরওয়েলের এ উপন্যাস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। আমরা বিভিন্ন বিপ্লবের ইতিহাস থেকে অনেক বিপ্লবী নায়ক দেখতে পাই। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই সফল হতে পারেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার আর আদর্শচ্যুতির ফলে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিপ্লবীরা নিজেরাই নিজেদের শত্রুতে পরিণত হয়।

শাসনব্যবস্থা যখন শোষণে রূপ নেয় তখন সমাজ ব্যবস্থা পাল্টাতে বিপ্লব বা যুদ্ধের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমরা যে ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লব বা যুদ্ধ দেখতে পাই, সেগুলো কি আদতে আমাদের শান্তি এনে দেয়? বাস্তবতা বলে, জীবন গল্পের মতো এত সাদামাটা নয়। এখানে যুদ্ধ শেষে আরেক যুদ্ধ শুরু হয়, বিপ্লবের পর আসে প্রতি-বিপ্লব। সুখে-শান্তিতে আর বসবাস করা হয়ে ওঠে না।

আর এই যে যুদ্ধের পেছনে যুদ্ধ তা নিয়ে দারুণ এক ব্যঙ্গাত্মক রূপকধর্মী উপন্যাস লিখে গিয়েছেন ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট, ইংল্যান্ডে। প্রথম প্রকাশের ৮০ বছর পূর্ণ করল বইটি। এ আট দশকে ৭০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে অ্যানিমেল ফার্ম। বইয়ের নামেই ১৯৫৪ ও ১৯৯৯ সালে নির্মিত হয়েছে দুটি চলচ্চিত্র। আর ২০২৩ সালে আধুনিক অ্যানিমেটেড রূপে তৃতীয়বারের মতো চলচিত্রে রূপান্তর হয় ‘অ্যানিমেল ফার্ম’।

বইয়ের গল্প মূলত একটা পশু খামারের কয়েকটা প্রাণীকে কেন্দ্র করে। খামারের মালিক মিস্টার জোন্স। তার খামারে রয়েছে শূকর, গরু, ঘোড়া, গাধা, ভেড়া, মুরগি, হাঁস, কুকুর, এমনকি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আর বিড়ালও। জোন্স এই প্রাণীদের দিয়ে অনেক পরিশ্রম করালেও খাবার বা বিশ্রাম দেন না ঠিকমতো। তাই প্রাণীরা ঠিক করে, তারা বিদ্রোহ করবে। যে শস্য ফলাতে প্রাণীদের এত শ্রম তার কিঞ্চিৎই জোটে তাদের ভাগ্যে, বেশিরভাগই নিয়ে যায় মানুষরা।

এসব অসঙ্গতি নিয়ে এক রাতে সকল প্রাণীর উদ্দেশে বক্তৃতা দেয় বয়স্ক শূকর ওল্ড মেজর। অন্যান্য প্রাণীও তাতে সায় দেয়। এর কিছুদিন পর মারা যায় ওল্ড মেজর। কিন্তু তার আদর্শ রয়ে যায়। যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ওল্ড মেজর বক্তৃতা দিয়েছিল, সেটা শ্রদ্ধার উদ্দেশ্যে চিহ্নিত করে রাখে তারা। এরপর স্নোবল আর নেপোলিয়ন নামের দুই তরুণ শূকরের নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়। খামারি মিস্টার জোন্সের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় প্রাণীরা। জোন্স পালিয়ে বাঁচেন। খামার চলে আসে প্রাণীদের দখলে। আগে যে খামারের নাম ছিল ‘ম্যানর ফার্ম’, এখন তার নতুন নাম দেওয়া হয় ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে স্নোবল ও নেপোলিয়ন। তাদের মতপার্থক্য রুপ নেয় তিক্ততায়। নষ্ট হয় বিপ্লবের আদর্শ।

অরওয়েলের এ উপন্যাস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। আমরা বিভিন্ন বিপ্লবের ইতিহাস থেকে অনেক বিপ্লবী নায়ক দেখতে পাই। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই সফল হতে পারেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার আর আদর্শচ্যুতির ফলে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিপ্লবীরা নিজেরাই নিজেদের শত্রুতে পরিণত হয়। যে স্বৈরাচার থেকে সাধারণ নাগরিকদের মুক্তির স্বপ্ন দেখান বিপ্লবীরা, পরবর্তী সময়ে তারাই স্বৈরশাসকে পরিণত হন। সাধারণ মানুষদের কখনো মুক্তি মেলে না।

১৯১৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে বিপ্লব ঘটে, স্তালিনের শাসনামলে সেই বিপ্লবের আদর্শ পুরোটাই নস্যাৎ হয়ে যায়। স্তালিনের সেই অসঙ্গতিপূর্ণ কর্মকাণ্ডকেই সার্বিকভাবে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে এই উপন্যাসটিতে। রুশ বিপ্লবের পর স্ট্যালিনের শাসনামলকে অবলম্বন করে লেখা হলেও এর গল্প আজ প্রায় আট দশক পরেও খুব প্রাসঙ্গিক।

আরও