কর্মক্ষেত্রে জেন জি দর্শনে বদলে যাচ্ছে মিলেনিয়ালদের গড়ে তোলা সংস্কৃতি

জেন জি প্রজন্ম দেখেছে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিষ্ঠা থাকলেও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। বছরের পর বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরও মুহূর্তেই চাকরি হারাতে পারেন একজন কর্মী। ফলে তারা নিজেদের পরিচয়কে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল করতে চায় না। তাই দক্ষতা, বিকল্প আয়ের উৎস ও ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

এক সময় চাকরিকে শুধু জীবিকা নয়, একজন মানুষের পরিচয়, মর্যাদা ও সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয়ের শুরুতেই প্রশ্ন উঠত—‘কী করেন?’ উত্তরেই তার সামাজিক অবস্থান ও সাফল্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের আগমনে সে ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে।

মিলেনিয়াল প্রজন্ম এমন এক সময় কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিল, যখন ‘ড্রিম জব’, অতিরিক্ত কাজ ও ক্যারিয়ার গড়ার নিরন্তর প্রতিযোগিতাকে সাফল্যের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হতো। দীর্ঘ সময় অফিসে থাকা, ছুটির দিনেও কাজ করা কিংবা কর্মক্ষেত্রকে ‘দ্বিতীয় পরিবার’ ভাবা অধিকাংশের কাছে স্বাভাবিক মনে হতো। চাকরি ছিল আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে জেন জি প্রজন্ম সে ধারণা থেকে সরে এসেছে। তাদের কাছে চাকরি জীবনের কেন্দ্র নয়, বরং একটি আর্থিক মাধ্যম। তারা মনে করে, চাকরি মূলত লেনদেন—সময় দেব, বেতন নেব, তারপর নিজের জীবনে ফিরে যাব। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, বন্ধু, ভ্রমণ, শখ কিংবা মানসিক সুস্থতার জন্য সময় দেয়াকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে ‘লাইভ টু ওয়ার্ক’র পরিবর্তে ‘ওয়ার্ক টু লিভ’ দর্শনই নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে।

এ পরিবর্তনের প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন জরিপে। ডেলয়েটের ২০২৪ সালের ‘জেন জি ও মিলেনিয়াল সার্ভে’ তে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ মিলেনিয়াল চাকরিকে তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সাফল্যের পরিচায়ক হিসেবে দেখে। যেখানে জেন জি প্রজন্মে এ হার মাত্র ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের বড় অংশ পেশাগত পরিচয়কে ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে আলাদা রাখতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং করপোরেট ছাঁটাইয়ের অভিজ্ঞতা। জেন জি প্রজন্ম দেখেছে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিষ্ঠা থাকলেও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। বছরের পর বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরও মুহূর্তেই চাকরি হারাতে পারেন একজন কর্মী। ফলে তারা নিজেদের পরিচয়কে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল করতে চায় না। তাই দক্ষতা, বিকল্প আয়ের উৎস ও ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

এ পরিবর্তন করপোরেট সংস্কৃতিকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বিনামূল্যের খাবার, আধুনিক অফিস কিংবা অনুপ্রেরণামূলক স্লোগানের চেয়ে নতুন প্রজন্ম ন্যায্য বেতন, নমনীয় কর্মব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত সময়ের প্রতি সম্মানকে বেশি মূল্য দিচ্ছে। একই সঙ্গে অনেকেই মূল চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা বা অন্য আয়ের পথও তৈরি করছেন, যাতে একটি চাকরির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে না হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে এ পরিবর্তন অলসতার প্রতিফলন নয়; বরং কাজ ও জীবনের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা। যে প্রতিষ্ঠান কর্মীদের সময়, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত জীবনকে গুরুত্ব দেবে, ভবিষ্যতের প্রতিভা ধরে রাখতে তারাই এগিয়ে থাকবে। কারণ নতুন প্রজন্মের কাছে চাকরি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই আর জীবনের একমাত্র পরিচয় নয়।

ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে

আরও