শীত-বসন্তের সন্ধিক্ষণে মৃদু বাতাসে গাছের পাতা ঝরে পড়ে, ধীর লয়ে। কোনো কোনো বর্ষাতি দিনে বৃষ্টিও এভাবে ঝরে, ঝিরঝির করে খুব সচেতন ভঙ্গিতে, যেন মাটির বুকে আঘাত দিতে চায় না। কখনোবা হঠাৎ আকাশ ভেঙ্গে নেমে সবকিছু কাকভেজা করে যায় ঝুম বৃষ্টি। আবার কখনো বিলাপ করতে করতে ক্লান্ত মানুষের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর মতো ঝরে অবিরাম ধারায়।
এমন বৃষ্টি দিনে কি গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী স্মৃতিকাতর হয়ে লিখেছিলেন, ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে পড়লো তোমায়’? তা জানা নেই। তবে সম্ভবত বৃষ্টির কান্না শুনে আমাদের সবার কাউকে মনে পড়ে। অথবা কেবল কোনো ঘটনা মানসপটে ভেসে ওঠে, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকে সে নিজেই।
মানুষ যা কিছু দেখে বা শোনে সেগুলোর মস্তিষ্কজাত একটা প্রভাব পড়ে আচরণ-অনুভবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রাকৃতিক পরিবেশ। দিনের উজ্জ্বল আলোয় শোরগোল, ব্যস্ততা আর ডেডলাইন সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। চাইলেও নীরব-নিভূত সময় মেলে না। যে কারণে ধূসর সন্ধ্যা বা গাঢ় অন্ধকার ঘনিয়ে এলে নীরবতা বাড়ে; চিন্তার পরিসর ছোট হতে থাকে। মানুষের মনোযোগ কোনো একক বিষয়ে ঘনিভূত হতে পারে। বর্তমান ইঁদুর দৌঁড়ের যুগে যেখানে মানুষ মন মতো মন খারাপ যাপন বা স্মৃতির জাবর কাটার সময় পায় না, সেখানে নীরব সময়ে হয়ে ওঠে বিষণ্নতার সমার্থক, স্মৃতিকাতর বা নস্টালজিয়ার প্রতিশব্দ।
আকাশের কালো মেঘ পৃথিবীতে যে ধূসরতা নিয়ে আসে সেটিও যেন কিছুক্ষণের জন্য সেই নীরব সময়ে নিয়ে যায় মানুষকে। তারপর মনে পড়ে কোনো কাছের মানুষকে, হারিয়ে যাওয়া কোনো দূরের মানুষকে। হয়তো তাদেরকে কেউ কেউ বলতে চায়, ‘বেদনাকে সাথী করে পাখা মেলে দিয়েছ তুমি/কতদুরে যাবে বল/তোমার পথের সাথী হব আমি’। কেউবা দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে বৃষ্টিস্নাত সড়কের দিকে চেয়ে মনে করে বাতাবি লেবুকে ফুটবল বানিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে দাপিয়ে বেড়ানো শৈশবের কথা, ফেলে আসা সত্তা, দিনের কথা; কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বসে চা খাওয়া, গানের আড্ডার কথা। কারো মনে পড়ে গত বর্ষার কদম ফুলের কথা। কেউ হয়তো শুনতে বসে যায়, ‘সঘন গহন রাত্রি, ঝরিছে শ্রাবণধারা’। কেউবা নিজেই গুনগুন করে, ’আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি, আমি রোদে পুড়ে ঘুরে ঘুরে অনেক কেঁদেছি’।
কেউ হয়তো এগুলোর কোনোটাই করে না। বৃষ্টি দিনে কেবল খিচুড়ি খাওয়ার জন্য জিভে পানি চলে আসে। সেই শখ পূরণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বৃষ্টির দিনে এ ধরনের অনুভব বা আচরণের পেছনে অনেক ধরনের মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, বৃষ্টির দিনের ঘ্রাণ। যাকে আমরা প্রায় বলি, সোঁদা মাটির ঘ্রাণ। এ ঘ্রাণ মানুষের একাধিক ঈন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে তোলে। ইংরেজিতে এটাকে বলা ‘পেট্রিকর (Petrichor)’। শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থে একটা ইতিহাস জানা যায়।
পেট্রিকর শব্দ এসেছে দুটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ থেকে—পেট্রোস, যার অর্থ শিলা বা পাথর, এবং ইকর, যা গ্রিক পুরাণে দেবতাদের শরীরে প্রবাহিত এক ধরনের ঐশ্বরিক তরলকে বোঝায়। বিজ্ঞানের পরিভাষায়, দীর্ঘদিনের শুকনো মাটি, পাথর ও জৈব পদার্থে কিছু রাসায়নিক উপাদান জমে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটায় সেই উপাদানগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। তখন আমরা একধরনের চেনা ঘ্রাণ পাই, যা আমাদের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। একই সঙ্গে এ ঘ্রাণ পুনর্জাগরণেরও ঈঙ্গিত দেয়। কারণ বর্ষাকাল প্রকৃতিকে সজীব করে তোলে এবং এটি গাছের চারা রোপণ তথা প্রকৃতির নতুনভাবে সেজে ওঠার সময়।
সবমিলিয়ে স্মৃতিকাতরতা, মন ভালো হয়ে যাওয়া, নস্টালজিক হয়ে পড়ার মতো নানা বিষয় নিয়ে হাজির হয় বৃষ্টির দিন। চারপাশের অনেক প্রয়োজনীয় শব্দের সরবতা কমিয়ে মানুষের মনকে নিয়ে যায় পুরনো অনুভূতিতে, তা হোক আনন্দের বা বেদনার, তবু কোথাও যেন মন বসে না- ‘মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা—মন চায়/মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে’।