বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নের তালিকা করতে গেলে ‘চালকুমড়ার মোরব্বা’র নামটি বিশেষ জায়গা দখল করে থাকবে। একসময় বিয়েবাড়ির মিষ্টির প্লেটে, ঈদের অতিথি আপ্যায়নে কিংবা পাড়ার হালুয়া-রুটির সঙ্গে ছোট্ট এক টুকরো স্বচ্ছ মোরব্বা ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক কেক, পুডিং আর চকলেটের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টান্নটি হারিয়ে যাচ্ছে।
তবে দেশের কিছু অঞ্চলে—বিশেষ করে নাটোর, বগুড়া, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল আর বরিশালে—চালকুমড়ার মোরব্বা তৈরির ঐতিহ্য টিকে আছে পারিবারিক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের হাত ধরে।
চালকুমড়ার মোরব্বা কীভাবে তৈরি হয়
চালকুমড়ার মোরব্বা বানানোর প্রক্রিয়া যেমন সময়সাপেক্ষ ও নিখুঁত। প্রথমে পরিপক্ব চালকুমড়ার সবুজ খোসা ছড়িয়ে ভেতরের নরম অংশ ফেলে কিউব বা লম্বা টুকরো করে কাটা হয়। এরপর টুকরোগুলো চুন বা ফিটকিরির পানিতে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হয়, যাতে এগুলো শক্ত ও স্বচ্ছ হয়। পরে ভালোভাবে ধুয়ে ফুটন্ত চিনির সিরায় ডুবিয়ে রাখা হয় দীর্ঘসময়—কখনো একদিন, কখনো দুই দিন পর্যন্ত।
সিরায় ফুটে ফুটে চালকুমড়ার টুকরোগুলো ধীরে ধীরে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, ভেতরে টানে মিষ্টি সিরা আর বাইরে তৈরি হয় হালকা ঝকঝকে আবরণ। এভাবেই জন্ম নেয় চালকুমড়ার মোরব্বা—একদিকে মচমচে, অন্যদিকে কোমল মিষ্টতা।
ঐতিহ্য ও স্বাদের ইতিহাস
চালকুমড়ার মোরব্বার শিকড় মোগল আমলে। ঢাকার নবাববাড়ি ও মুর্শিদাবাদের দরবারে ফল, ফুল ও সবজি থেকে নানা রকম মিষ্টান্ন তৈরি হতো। স্থানীয় রাঁধুনিরা তখন চালকুমড়াকে চিনি ও গোলাপজল মিশিয়ে রূপান্তর করতেন রাজকীয় ডেজার্টে। ইংরেজ আমলেও ঢাকার চকবাজার ও পুরান ঢাকায় উপহার হিসেবে মোরব্বা জনপ্রিয় ছিল।
‘মোরব্বা’ শব্দটি এসেছে আরবি মুরব্বা থেকে, যার অর্থ হলো ‘চিনিতে সংরক্ষিত ফল বা সবজি’। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে চালকুমড়া, আম, আনারস, এমনকি পেয়ারা দিয়েও মোরব্বা তৈরি করা হতো, তবে চালকুমড়ার মোরব্বাই পেয়েছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী খ্যাতি।