গান, গল্প, কথা আর স্মৃতির মেলা

'নাগমে... কিসসে... বাতে... ইয়াদে...' অর্থাৎ, 'গান... গল্প... কথা... স্মৃতি...' নামের মতোই বইটা। প্রতি অধ্যায় আনন্দ বকশীর কোনো না কোনো গানের সরাসরি নাম বা তার সঙ্গে মিল রেখে শুরু করে

আনন্দ বকশীর নাম জানি সে তো বহুকাল। তবে বলিউড সিনেমার লিরিসিস্ট সম্পর্কে খুব বেশি ঘাঁটার চিন্তা কখনো হয় নাই। আগ্রহ জাগতে শুরু করছিল এক সময় গুলজারের কারণে। তবে তারে নিয়েও বেশি ঘাঁটি নাই। এর মধ্যে গত দুই বছর সিনেমার মানুষদের বইপত্র পড়তেছি। আত্মজীবনী পছন্দ আর সিনেমার মানুষদের আত্মজীবনী থেকে ভেতরের অনেক কথা জানা যায়। তবে আনন্দ বকশীকে নিয়ে এই বইটা তার জীবনী, লিখেছেন তার ছেলে রাকেশ আনন্দ বকশী।

'নাগমে... কিসসে... বাতে... ইয়াদে...' অর্থাৎ, 'গান... গল্প... কথা... স্মৃতি...' নামের মতোই বইটা। প্রতি অধ্যায় আনন্দ বকশীর কোনো না কোনো গানের সরাসরি নাম বা তার সঙ্গে মিল রেখে শুরু হয়। মোটামুটি সময়ক্রম অনুসরন করেই বাবার জীবন কথা লিখেছেন রাকেশ। শুরু করেছেন রাওয়ালপিণ্ডি থেকে, সেখানেই জন্ম আনন্দর। এরপর ভারত ভাগ এবং তারা রিফিউজি হয়ে যান। তবে পুলিশ অফিসার ছিলেন আনন্দর দাদা। তাই খুব একটা সমস্যা হয়নি।

পরিবারের চাপে আনন্দ যুক্ত হয়েছিলেন আর্মিতে। কিন্তু ছোট বয়স থেকেই তার গান লেখার ঝোঁক ছিল। আর্মি থেকে দুইবার বেরিয়ে যান তিনি। প্রথমবার বোম্বেতে তার ঠাই হয়নি কিন্তু দ্বিতীয় বার তিনি মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। প্রায় ছয় বছর চেষ্টার পর সফল হন তিনি। এরপর প্রায় ৫০ বছর কোনো থামাথামি নেই। ৬০০-র বেশি সিনেমায় সাড়ে তিন হাজারের মতো গান লিখেছেন।

বইটা বাতিঘর থেকে নেওয়া। অন্তত তিনবার হাতে নিয়ে রেখে দিয়ে শেষে কিনছিলাম। সন্দেহ ছিল কেমন হবে না হবে। কিন্তু পড়তে গিয়ে খুবই ভালো লাগল। এর একটা কারণ বইটা লেখার ধরণ। রাকেশ কেবল ধারাভাষ্যের মতো করে বাবার জীবনী বলে জাননি। তিনি প্রতিটি ঘটনা, পরিস্থিতির সঙ্গে আনন্দ বকশীর লেখাকে মিলিয়েছেন। জীবনী বলতে বলতে একটা গল্প বলেছেন। গল্পের মাঝখানে বাবার সঙ্গে তার স্মৃতি, তার বাবার স্মৃতি অন্য কারো সঙ্গে, তুলে দিয়েছেন। এই বইয়ের অনেকটাই আসলে আনন্দ বকশীর নিজের লেখা কেননা রাকেশ তার বাবার ডায়রি থেকে কোট করেছেন। কিন্তু কোনো কোটই হুট করে আসেনি। বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বাবার বয়ান এনেছেন। সেই কারণেই বলা যায় জীবনী লেখার ক্ষেত্রে বইটা 'ওয়েল রিটেন'।

আনন্দ বকশীর একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। পিণ্ডি থেকে আসার পর তাদের পরিবারের সবাইকে জড়ো করে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কে কী সঙ্গে করে এনেছে। রাকেশ বলেছিলেন তিনি কেবল তার মায়ের ছবি এনেছেন। সে কারণে বড়রা তাকে বকেছিলেন। উত্তরে রাকেশ বলেছিলেন, 'স্থাবর অস্থাবর যা হারিয়ে এসেছি তা হয়ত আবার নতুন করে তৈরি করা যাবে। কিন্তু আমার মায়ের ছবি তো আর কোথাও পাওয়া যাবে না।'

আরও