শহুরে জীবনে আমাদের বেশির ভাগ সময় কাটে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চার দেয়ালের ভেতরে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, যাতায়াতের সময় আবদ্ধ মেট্রো কিংবা গাড়িতে থাকা এবং অবসর সময়ে মুঠোফোনে বুঁদ হয়ে থাকার কারণে খোলা আকাশের নিচে রোদে যাওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত ইনডোরমুখী এই জীবনযাত্রার কারণে জেনারেশন হিসেবে আমরা মারাত্মকভাবে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি বা ডেফিসিয়েন্সিতে ভুগছি।
সূর্যের আলো থেকে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি তৈরি না হওয়ায় এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে। ভিটামিন ডি মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। এ হরমোনগুলো আমাদের মেজাজ ভালো রাখে এবং কাজের অনুপ্রেরণা বাড়ায়। রোদের অভাব ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে এই হরমোনগুলোর নিঃসরণ কমে যায়, যা ধীরে ধীরে মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। গবেষণা বলছে, সূর্যের আলো কম পেলে বা এর ঘাটতি হলে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
শুধু ডিপ্রেশন নয়, ভিটামিন ডি ও রোদের অভাবে শরীরে আরো নানা রকম শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দেয়। প্রবীণ বয়সে ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের মতো স্মৃতিভ্রংশ রোগের ঝুঁকি এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এছাড়া শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রাগ, অতিরিক্ত চিন্তা, ঘুমের সমস্যা এবং পোস্টপার্টাম বা প্রসবপরবর্তী বিষণ্নতা বৃদ্ধিতেও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং হাড় ও পেশির ব্যথাও এই ভিটামিনের অপ্রাপ্তিরই ফল।
যান্ত্রিক এ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে এবং মনকে হাসিখুশি ও সতেজ রাখতে নিয়মিত সূর্যের আলো গায়ে লাগানোই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়। রোদে সময় কাটালে শরীর কেবল ভিটামিন ডি-ই তৈরি করে না, বরং এটি বেটা-এন্ডোরফিন ও নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণ করে যা শরীরের মানসিক চাপ, ব্যথা ও প্রদাহ কমায়।
তাই দিনের কাজের ব্যস্ততার ফাঁকেই সকাল বা দুপুরের দিকে অন্তত ১৫-২০ মিনিট রোদে হাঁটাচলা করা বা খোলা হাওয়ায় সময় কাটানো উচিত। কিংবা অফিসের কাজের মাঝেই ব্রেক নিয়ে কিংবা জানালার পাশে বসে খানিকটা রোদ গায়ে মাখলে মানসিক স্বাস্থ্যের দৃশ্যমান উন্নতি ঘটে এবং কর্মস্পৃহা বহুগুণ বেড়ে যায়।