বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ‘অভিযুক্ত’, সমাজের আয়নায় মনস্তাত্ত্বিক দহন

সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে বিশ্বজিৎ চৌধুরী একজন শক্তিশালী কথাকার। তার ‘অভিযুক্ত’ উপন্যাসটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মানুষের মনের জটিল অলিগলির নিপুণ মানচিত্র। উপন্যাসের মূল চরিত্র আ ম ম শাহজাহান, যিনি একাধারে প্রথিতযশা অধ্যাপক, প্রাজ্ঞ চিন্তক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী উপাচার্য হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী। নির্ঝঞ্ঝাট সংসার আর সামাজিক সম্মানের ঘেরাটোপে তার জীবন যখন মসৃণ গতিতে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে পড়ে তার মাথায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া তার প্রাক্তন ছাত্রী দেবযানী সাহা অভিযোগ তোলেন, তিনি শাহজাহান কর্তৃক যৌনহেনস্তার শিকার হয়েছেন। শাহজাহানের পরিবারে মেয়েটির একসময় অবাধ যাতায়াত ছিল। তার স্ত্রী তসলিমার সঙ্গে ছিল গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তারা একই জেলার মেয়ে। প্রতারক ও প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে স্বয়ং দেবযানী। মৃদুভাষী-অচঞ্চল মেয়েটির অভিযোগ শাহজাহান, তার স্ত্রী, সহকর্মী এমনকি পাঠককেও ধন্দে ফেলে দেয়। অভিযোগটি কি সত্যি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?

এই একটি অভিযোগ শান্ত দিঘিতে প্রবল এক পাথর নিক্ষেপ করে। উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস, শুরু হয় শিক্ষক রাজনীতি আর ছাত্রনেতাদের ক্ষমতার লড়াই। লেখক অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে দেখিয়েছেন একটি অভিযোগ কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের অন্ধকার জগতকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে। একে একে দৃশ্যমান হতে থাকে শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্রনেতা শোয়েব কামরান, ছাত্রী হলের দাপুটে নেত্রী হোসনে আরাসহ অনেকেই।

আর তখনই স্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে আরেকটি চরিত্র, নিগার সুলতানা। কলকাতায় রবীন্দ্র ভারতীতে পিএইচডি করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের মেয়ে নিগারের তুমুল প্রেমে পড়েছিলেন শাহজাহান। সেই প্রেম ছিল গভীর আর শাশ্বত; গোপন সম্পদের মতো মূল্যবান সেসব স্মৃতি। এখানেই লেখক পাঠককে এক মনস্তাত্ত্বিক ধাঁধায় ফেলে দেন। যে মানুষটি এমন যত্নে প্রেম লালন করতে পারেন, যিনি নিজের স্ত্রীর প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল, তিনি কি আদৌ এমন জঘন্য লালসা চরিতার্থ করতে পারেন? প্রেম, নৈতিকতা এবং লালসার সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে কাহিনীটি এগিয়ে চলে।

বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সার্থকতা তার পরিমিতিবোধে। উপন্যাসে কাহিনীর প্রয়োজনে প্রেমের শরীরি বর্ণনা এলেও তা কোথাও সস্তা বা বিচ্যুত মনে হয়নি। বরং তা শৈল্পিক রূপ পেয়েছে। ছোট ছোট বাক্য আর আটপৌরে শব্দের মাধ্যমে তিনি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যা পাঠককে নিজের চারপাশের চেনা জগতের গল্প মনে করিয়ে দেয়। উপন্যাসের সমাপ্তিতে রহস্যের যবনিকা উঠলেও এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস আর অমিমাংসিত এক ‘কেন’ পাঠকের মনে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এই যে ঘোর গল্প শেষ হয়েও রেশ থেকে যাওয়া এটাই বিশ্বজিৎ চৌধুরীর মুন্সিয়ানা।

‘অভিযুক্ত’ কেবল একটি সামাজিক উপন্যাস নয়, বরং এটি মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আর চারিত্রিক দ্বৈতনীতির গভীর ব্যবচ্ছেদ। এর প্রেক্ষাপট আদি হতে অনাদিকাল পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উপন্যাসের সমাপ্তিতে তাসলিমার মতো পাঠকও গভীর জলে তলিয়ে যেতে থাকে। যেমন তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ, শিক্ষা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং ভালোবাসা।

বই: অভিযুক্ত

লেখক: বিশ্বজিৎ চৌধুরী

প্রকাশনী: প্রথমা

মলাট মূল্য: ৩৪০ টাকা

আরও