একসময় সন্তানকে নিয়ে অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল—সে কখন হাঁটবে, কখন কথা বলবে, কখন স্কুলে যাবে, কার সঙ্গে মিশবে, বড় হয়ে কী হবে। এখন প্রশ্নগুলো বদলে গেছে। কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে? ইউটিউবে কী দেখছে? চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছে কি-না? রাতে ঘুমানোর আগে ফোন নামায় তো?
গত কয়েক বছর ধরে এসব প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জেন জি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার—সব আলোচনাই যেন তাদের ঘিরে। অথচ নীরবে বড় হয়ে উঠেছে আরেকটি প্রজন্ম, যাদের নিয়ে এখনো আমাদের প্রস্তুতি খুব কম। তারা হলো জেন আলফা—২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া শিশু-কিশোররা।
অনেক বাবা-মা এখনো তাদের ‘ছোট বাচ্চা’ ভেবে ভুল করেন। অথচ এ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সদস্যদের বয়স এরই মধ্যে ১৫ বছর। তারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে, পরিবারের কেনাকাটায় মতামত দিচ্ছে, নিজের পছন্দ-অপছন্দ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় প্রজন্ম—সংখ্যায় প্রায় ২০০ কোটি। ভবিষ্যতের সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির গতিপথ অনেকটাই নির্ধারণ করবে তারা।
আগের প্রজন্ম কোনো তথ্য জানতে শিক্ষক, বই বা পরিবারের ওপর নির্ভর করত। এখন কয়েক সেকেন্ডেই অসংখ্য উত্তর হাজির হয়। কিন্তু সব উত্তর যে সঠিক, তা নয়। ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি কিংবা এআই-নির্ভর ভুল তথ্য—সবই এখন হাতের নাগালে। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেন আলফাকে শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, তথ্য যাচাই করাও শেখাতে হবে
জেন জি ইন্টারনেটের বিকাশের সঙ্গে বড় হয়েছে। কিন্তু জেন আলফা জন্ম থেকেই ডিজিটাল। তাদের কাছে ইউটিউব, ভিডিও কল, ভয়েস সার্চ, স্মার্ট টিভি কিংবা এআই কোনো নতুন প্রযুক্তি নয়; এগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন অনেক অভিভাবক। তারা মনে করেন, যেহেতু সন্তান প্রযুক্তিতে দক্ষ, তাই সে নিরাপদও। বাস্তবতা ভিন্ন। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারা আর প্রযুক্তির ঝুঁকি বোঝা এক বিষয় নয়। ভুয়া তথ্য, সাইবার বুলিং, অনুপযুক্ত কনটেন্ট কিংবা অ্যালগরিদমের প্রভাব সম্পর্কে তাদের সচেতনতা এখনো সীমিত। ফলে ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল প্রজ্ঞা—যা শেখানোর দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে।
জেন আলফাকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা—তারা সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে ডুবে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। অনেক শিশু বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, বোর্ড গেম খেলা, এমনকি প্রচলিত খেলনার প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে। ডিজিটাল পৃথিবীতে জন্মে তারা এরই মধ্যে ডিজিটাল ক্লান্তিও অনুভব করছে। আর তাই আর ডিজিটাল বন্দি হতে চায় না।
শিশুরা কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে। এই সত্য জেন আলফার ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রযোজ্য। মনোবিজ্ঞানীরা এখন একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করছেন—টেকনোফেরেন্স। অর্থাৎ সন্তান যখন কথা বলতে আসে, আর বাবা-মা তখন মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন; কিংবা খাওয়ার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেও প্রত্যেকে নিজের স্ক্রিনে ডুবে থাকেন—এ ধরনের প্রযুক্তিগত বাধাকেই বলা হচ্ছে টেকনোফেরেন্স।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের অভ্যাস শিশুর আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তানকে মোবাইল কম ব্যবহার করতে বলার আগে তাই অভিভাবকদের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহারের দিকেও নজর দেয়া জরুরি।
আগের প্রজন্ম কোনো তথ্য জানতে শিক্ষক, বই বা পরিবারের ওপর নির্ভর করত। এখন কয়েক সেকেন্ডেই অসংখ্য উত্তর হাজির হয়। কিন্তু সব উত্তর যে সঠিক, তা নয়। ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি কিংবা এআই-নির্ভর ভুল তথ্য—সবই এখন হাতের নাগালে। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেন আলফাকে শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, তথ্য যাচাই করাও শেখাতে হবে।
জেন জি ইন্টারনেটের বিকাশের সঙ্গে বড় হয়েছে। কিন্তু জেন আলফা জন্ম থেকেই ডিজিটাল। তাদের কাছে ইউটিউব, ভিডিও কল, ভয়েস সার্চ, স্মার্ট টিভি কিংবা এআই কোনো নতুন প্রযুক্তি নয়; এগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ
জেন আলফার শৈশব কেটেছে মহামারি, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক সংকটের খবর শুনে। ফলে তারা অনেক সময় ইচ্ছে করেই অতিরিক্ত নেতিবাচক সংবাদ এড়িয়ে চলে। এটিকে উদাসীনতা মনে হলেও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মরক্ষার কৌশল। একই সঙ্গে তারা পরিবেশ, প্রাণীর অধিকার, বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়েও আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি সচেতন।
জেন আলফার বড় হওয়া এমন সময়ে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি ও দৈনন্দিন জীবন বদলে দিচ্ছে। তারা হয়তো এমন প্রথম প্রজন্ম, যারা স্কুলজীবনের শুরু থেকেই এআই-কে পড়াশোনার সহকারী হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি যেমন শেখার নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি একটি নতুন প্রশ্নও সামনে আনছে—শিশুরা কি নিজেরা চিন্তা করবে, নাকি সব উত্তর এআইয়ের কাছ থেকেই নেবে? তাই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, সেটিই শেখানো হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জেন জি আর জেন আলফাকে এক কাতারে ফেললে ভুল হবে। জেন জি প্রযুক্তির বিস্ময় দেখেছে। জেন আলফা প্রযুক্তিকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে দেখছে। জেন জি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে ভালোবাসত। জেন আলফা বরং বেশি পর্যবেক্ষক। তারা দেখে, শেখে, সংরক্ষণ করে; কিন্তু সবকিছু প্রকাশ করে না।
দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে