‘এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া...’
আপাদমস্তক বোহেমিয়ান কবি আবুল হাসান রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভবুঘুরে শাস্ত্র’ পড়েছিলেন কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু তার একটা গল্পের নাম ছিল ‘নির্বাসনায় মাইল মাইল’। এখানে নির্বাসনা কিন্তু নির্বাসনের বিকল্প কোনো শব্দ না। বরং নির্বাসনা হলো যাবতীয় বাসনা থেকে মুক্ত হওয়ার অভিলাষ। একজন বোহেমিয়ানের পক্ষেই আসলে নির্বাসনার নির্মোহ নির্বাণের দিকে পা বাড়ানো সম্ভব। সেখানে কালিমা না ছুঁয়ে চিবুক ছুঁতে চাইবার বাসনাও আদতে নিজের দিকে যাবারই এক প্রয়াস। আর সাহিত্যের, শিল্পের একটা বড় অনুপ্রেরণা আসে ভবঘুরেমির হাত ধরে। ঘুমক্কর, ঘনচক্কর, ভবঘুরে, বোহেমিয়ান- যে নামেই ডাকা হোক না কেন এই লাইফস্টাইল ক্রিয়েটিভ মানুষজনের চিন্তার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
অনেক সময় মনে হয়, লেখকদের যে কোনো লেখার পেছনে থাকা পাপেটমাস্টার আইডিয়া আসলে আসে কোত্থেকে? কিছু ক্ষেত্রে আইডিয়া অলৌকিকভাবে এলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আসে অবজার্ভেশন থেকে। ভীষণ গিফটেড হয়েও আদতে অনেক সাহিত্যিক আইডিয়ার খরায় ভোগেন। ধরা যাক, আমাদের মস্তিষ্ক দারুণ শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের মতো। দুর্দান্ত প্রসেসর, টেরা টেরা স্টোরেজ, র্যামের তো কথাই নাই। গ্রাফিক্স ও সেইরকম। কিন্তু সেই কম্পিউটারে যদি কোন সফটওয়ারই না ইন্সটল করি? যদি কোন ডেটাই না থাকে? তবে আমরা কী প্রসেস করব? কাজই বা কী করব? তার মানে আমাদের কাজ করার জন্য দরকার আইডিয়া, ইমোশন, ক্যারেকটার। সফটওয়ার লাগবে, লাগবে ডেটা। সেই ডেটা প্রসেস করে ভালো গ্রাফিক্স এর পর সেটা আমরা পূর্ণাঙ্গ একটা কাজ আকারে শেষ করবো।
মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হলো, সে কোনো কম্পিউটার না যে কয়েকটা সিডি বা পেনড্রাইভ থেকে কিছু জিনিস কপি পেস্ট করে ভরে দিলাম, আর সে সব বুঝে গেল। তার বুঝতে হয় নিজের চারিদিক থেকে দেখে দেখে, শুনে শুনে। তবে কেউ যদি সারাজীবন তার আশপাশ থেকে সব দেখে ফেলে বা শুনে ফেলে তারপরেও কিন্তু বিশাল যেই মানবসভ্যতার ইতিহাস তার কিছুই তার জানা হবে না। এই সমস্যার একটা দারুণ সমাধান হলো ভ্রমণ আর বই।
স্পেনের প্যাম্পালোনায় ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের লড়াই দেখতে গিয়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে লিখেছিলেন ‘The Sun Also Rises’। ইতালি, ইন্দোনেশিয়া আর ভারতের পথে ঘুরতে ঘুরতে এলিজাবেথ গিলবার্টের কলম দিয়ে বেরিয়েছিলো ‘Eat, Pray, Love’ এর মতো উপন্যাস। লন্ডনে টিপ টিপ বৃষ্টির মাঝে নির্জন রাস্তায় পা ফেলতে ফেলতে ভার্জিনিয়া উলফ উপন্যাসের দৃশ্য সাজাতেন। ইতালিতে থাকতে থাকতেই ঝুম্পা লাহিড়ী ইতালিয়ান ভাষায় লিখে ফেলেছেন ‘Whereabouts’।..দীর্ঘ ফ্লাইটে বসে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন 'দেয়াল' উপন্যাসের খসড়া। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বোহেমিয়ান জীবন নিয়ে বলতে গেলে একটা আলাদা প্রবন্ধই লেখা যাবে। সুনীলের লেখাতেই তো জানা যায়, অ্যামেরিকার বিট জেনারেশনের এক দঙ্গল বোহেমিয়ান সাহিত্যিকদের কথা। আলেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক, উইলিয়াম এস. বারোজ...
ক্যামেরার শাটার টিপে তোলা কিছু ঝাপসা ছবি, আলগোছে নেয়া নোটস, মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা চিন্তার নাগরদোলা, চোখে আটকে যাওয়া কোনো দৃশ্য কিংবা ভ্রমণে সদ্য পরিচিত কোনো ব্যক্তির আলাপ-শরীরী ভাষা হয়ে উঠতে পারে লেখালিখির রসদ। এখানেই ক্রিয়েটিভ মানুষ বোহেমিয়ান হবার তাড়না অনুভব করে।
প্রসঙ্গত W. G. Sebald-এর কথা মনে পড়ে। যিনি ইউরোপজুড়ে হেঁটে বেড়ানোর মধ্যে নিজস্ব স্মৃতি, ইতিহাস ও ভাষার স্তর খুঁজে ফিরতেন। তার “The Rings of Saturn” পুরো বইটিই এক ধীরগতির হাঁটা, যা পাঠককে ঘুরিয়ে আনে ইতিহাস, আত্মজিজ্ঞাসা আর ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে। এই উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে হাঁটতে নিজের সঙ্গে কথা বলা যায়। খানিক থেমে দেখে নেয়া যায় অস্তরাগের আকাশ। শোনা যায়, গাছের সঙ্গে হাওয়ার কথা বলার ভাষা। দূর থেকে সমকালীনতপ্ত সমাজের ভিনেটেড ভিড়ের ছবি তুলে নেয়া যায় মাথার মধ্যে।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন ‘ভবঘুরে শাস্ত্র’ আসলে লিখেছেন সেসব মানুষের জন্যই যারা ঘর ছেড়ে আত্মানুসন্ধানে বেরিয়ে পড়তে চায়। আর ভবঘুরেদের এই ভ্রমণের ম্যানিফেস্টোতে সবার উপরে জায়গা পেয়েছে গৌতম বুদ্ধ। নামে শাস্ত্র হলেও বইয়ের সারমর্ম হলো মুক্ত জীবন, বুদ্ধিমত্তা ও সচেতন ভ্রমণপন্থা।
আমরা যখন ভ্রমণ নিয়ে ভাবি, তখন তা কেবল স্থানান্তর নয়, বরং এক অভ্যন্তরীণ গতির কথাও বলে—যেখানে চিন্তা, অনুভব ও স্মৃতি চলমান থাকে। এই চলার ভেতরেই জন্ম নেয় লেখালেখির এক বিশেষ ভূগোল। যেমনটি আমরা দেখি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্পেনের অভিজ্ঞতায়, আগাথা ক্রিস্টির ট্রেনযাত্রায় কিংবা হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘নদীপথে, সঙ্গে ইউলিসিস’-এ। এরা সবাই লেখার জন্য মোশন খুঁজেছেন—যেন চিন্তা সচল রাখতে হলে শরীরকেও সচল রাখতে হয়। এই প্রসঙ্গে রাহুল সাংকৃত্যায়নের 'ভবঘুরে শাস্ত্র' এক অনন্য নিদর্শন। তিনি শুধু ভ্রমণ করেননি, বরং ভ্রমণকে জীবনদর্শনের কেন্দ্রে বসিয়েছেন। ভবঘুরে, তার ভাষায়, কেবল একজন পর্যটক নয়—একজন দার্শনিক, সংগ্রাহক, দৃষ্টিপাতকারী ও জীবন-পর্যবেক্ষক। ভবঘুরে শাস্ত্র হল সেই সৎ সাহসী মানুষের জন্য, যে বহমান জীবনের মধ্যে নিজেকে নির্মাণ করে। রাহুল বিশ্বাস করতেন, ভবঘুরে হতে হলে, একলা চলার সাহস থাকতে হয়। প্রতিটি পরিবেশ, গন্ধ, মুখ, দেয়ালের রঙ—স্মরণে ধরে রাখতে হয়। একাকীত্বে অভ্যস্ততা, নিজের সঙ্গে নিজের সংলাপ। হোটেলের জানালায় বসে, পাহাড়ি রাস্তায় হেঁটে, মঠের পাশে চুপ করে বসে থেকে রাহুল নিজের ভেতরের ভূগোল আবিষ্কার করতেন।
এই হ্যান্ডবুকের ১৬টা অধ্যায়ে বিভক্ত বইয়ের প্রথম অধ্যায় অথ ভবঘুরে জিজ্ঞাসা। যেহেতু বইয়ের নাম শাস্ত্র, তাই রসিকতা করেই সংস্কৃত দিয়ে শুরু করলেন রাহুল। বলেই দিলেন, তার বিবেচনায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু হলো ভবঘুরেমি। এই ভবঘুরেমির নিরপরাধ অভ্যাস মাঝখানে ভুলে যাওয়ায় উল্টো আমাদের উপমহাদেশের লোকজন গলায় দাসত্বের ফাঁস পরেছে। অথচ মধ্যযুগে পৃথিবীর সব অনাবিষ্কৃত জায়গার অনাবাদি ভূমি অধিকার করার ক্ষমতা ছিল আমাদের। স্রেফ আলসেমির কারণে এখনো আমরা মানসিক দাসত্বে ভুগছি। তারপর ধর্ম থেকে, ইতিহাস থেকে উদাহরণ টানা হয়েছে, ভবঘুরেমিই কেন সেরা শাস্ত্র।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাহুল দেখালেন ভবঘুরে হবার পথে ব্যারিকেড হয়ে থাকা সামাজিক পিছুটানকে। পরিবার, সমাজ আর মানসিক জড়তার এক বেড়াজালে আটকে আমরা এখন কেন বোহেমিয়ান হতে পারি না তা অক্ষরে অক্ষরে বুঝালেন লেখক। তৃতীয় অধ্যায়ে এসে বিদ্যা আর বয়স ভবঘুরেমির কী ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা দিলো। শিক্ষা ব্যাপারটা যে জরুরি আর তা শেষ করেই ভবঘুরেমি করা চাই সেটা তিনি এখানে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর শিক্ষার ভেতরে তিনি এনে ফেললেন ভাষাশিক্ষা, ম্যাপ দেখা, ভূগোলের জ্ঞান। ভবঘুরেকে হতে হবে স্বাবলম্বী। তাই তাকে যেমন ভাষা জানতে হবে, জানতে হবে এমন কিছু কাজও, যেগুলো ভ্রমণের খরচটাকে সামলে নেয়। ফটোগ্রাফি নিয়েও তিনি বলেছেন, এটা একটা সুইটেবল প্রফেশন হতে পারে। এই পুরোনো বইয়ে করা ভবিষ্যৎবাণী ফলে গেছে। ট্রাভেল ভ্লগার,ফটোগ্রাফাররা কীভাবে পৃথিবী ঘুরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তা চোখের সামনে দেখা যায়। দেশের নাদির অন দ্য গোর কথাই ধরেন না। একইভাবে লেখালিখি আর ডাক্তারিও ভবঘুরেদের জন্য আদর্শ পেশা। সাথে শিখতে হবে বয়ে বেড়ানো যায় এমন কোনো বাদ্যযন্ত্র। বাঁশি,হারমোনিকা এক্ষেত্রে আদর্শ।
পরের দুটো অধ্যায় জুড়ে ভারতের আনএক্সপ্লোরড আর ভবঘুরে জাতিগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে মেলামেশার গতি-প্রকৃতি বলেছেন। প্রশ্ন এসেছে,মহিলা হলে কি ভবঘুরে হওয়া যাবে না? তিনি মহিলাদের ভবঘুরে হওয়ার ব্যাপারেও জ্ঞান দিয়েছেন, ইতিহাস-ধর্ম-মিথ থেকে টেনে এনেছেন উদাহরণ। ধর্মের সঙ্গে ভবঘুরেমির সম্পর্কও বাদ পড়ে নি। এসেছে প্রেম, দেশ-জ্ঞান আর ভবঘুরেমির সম্পর্ক। কলম আর তুলি অধ্যায়ে এসে দেখা গেছে, এত ভবঘুরেমি করে যদি সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া না যায় তাহলে সেই ভবঘুরেমির কোন উদ্দেশ্যই রইলো না। কেউ জানলো না- সেই ঘোরাঘুরির ফসল, অনাস্বাদিত নতুন জনপদের কথা। তাই পরের অধ্যায়ে উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণের-ভবঘুরেমির নেগেটিভ দিকটাই তুলে ধরেছেন তিনি। এরপর তরুণীদের কর্তব্য আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভবঘুরে জীবনের স্মৃতি বা স্যুভেনির সংগ্রহের গুরুত্ব দিয়ে উপসংহার টানা হয়েছে এই ম্যানিফেস্টোর।
যে কোন শাস্ত্র অধিকারের প্রথম শর্তই হলো—সমর্পণ। ভবঘুরেমিকে জীবনের আদর্শ হিসেবে মেনে নিয়ে সারা জীবন ঘোরার ব্রত নেয়া। কর্পোরেট দাসত্ব করা সমাজের ক্যালেন্ডার দেখে ছুটি নিয়ে ঘোরাঘুরি, বিয়ে, ট্যুর অপারেটরদের বাঁধা ধরা ট্রিপ শেষ করে কেবল নাম কামানোর উছিলায় পত্রিকায় লেখা ছাপানো-এসব কিছু ভবঘুরেমিকে আসলে বুড়ো আঙুল দেখায়। তারপরও এখন এই বই পড়ে ভবঘুরে হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা- অনেকটা চে গুয়েভারার ছবি মারা গেঞ্জি পরে বিপ্লবী হওয়ার মতো অবস্থা। তবুও মন চায় একদিন বিমল মুখার্জীর মতো সাইকেল নিয়ে পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়তে।
৫০ বছরের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো একাকী নারী পর্যটক ডার্ভালা মারফির মতো মনকে বলতে ইচ্ছে করে,‘একা একা পৃথিবী ঘোরার জন্য শুধু সাহসের দরকার না,দরকার আগ্রহের।’তারেক অণু-তানভীর অপুর অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শুনে হাপিত্যেশ করি। আর উইকেন্ডে এখানে ওখানে দৌড়ে জীবনপুরের পথিক হবার ব্যর্থ চেষ্টা। শুধু চোখের সামনে ভাসে জিপসি তাঁবুর ঝলমলে আলো। নাকে আসে ইরানি গোলাপের খুশবু। আর শুনি হাতির বৃংহতি। তখন মনে হয় ‘মোটর সাইকেল ডায়েরিজ’ সিনেমার মতো বেরিয়ে পড়ি সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে। দু’হাত ছড়িয়ে বলতে চাই, ‘ভবঘুরে পন্থার জয় হোক।’