ওবায়েদ হকের ফ্যান্টাসির এক দুনিয়া

ওবায়েদ হক একটা মায়াবী দুনিয়া তৈরি করতে চান। তার চরিত্রের প্রতি তার পাঠক স্নেহ, সহমর্মিতা অনুভব করবে। আর সেটা তৈরি করতে নাটকীয় মোড়, দুর্যোগ, দুর্ঘটনাময় গল্প তৈরি করেন লেখক। তার নীল পাহাড়, জলেশ্বরীতেও এই ফর্মুলা রয়েছে

বাংলাদেশের উপন্যাসের পাঠক এখনো ফ্যান্টাসি পছন্দ করেন। ফ্যান্টাসি বলতে আমরা এখন আরআর মার্টিন, জেকে রাওলিংদের বলা গল্পগুলোর ধারাকেই বুঝি। কিন্তু ফ্যান্টাসি মূলত একটা ধারণা। বাস্তবের সঙ্গে যার যোগ সামান্য। সে জায়গা থেকেই আমার কাছে ওবায়েদ হকের গল্পের দুনিয়াকে ফ্যান্টাসি মনে হয়। ‘ড্রামা’ বলতে পারতাম, ইউটোপিয়াও বলতে পারতাম, কিন্তু ঐ দুটো বিষয়ের তুলনায় ফ্যান্টাসি কথাটাই আমার মাথায় বেশি কাজ করল।

‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তার ডাকনাম ভুলে যায়। আমরা ভুলে যাবার আগে জানিয়ে দিই, তার নাম হাসান। হাসানের বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন। তার ছিল জমিদার পূর্বপুরুষের বংশ গৌরব। বাস্তব দুনিয়া তিনি বুঝতেন না। বই পড়তে ভালোবাসেন। কিন্তু জাগতিক অন্যান্য বিষয় থেকে তিনি দূরে। তিনি বোঝেন না ব্যক্তির উন্নতি। বোঝেন না অর্থ উপার্জনের বন্দোবস্ত। ফলে তার চাকরিটি যায়। মরা সন্তান প্রসব করে স্ত্রী। তাকে বাঁচাতে পৈতৃক বাড়িটা হারাতে হয়। তারা খবর পান মহিমগঞ্জ নামে এক স্থানে তার চাচার একটি জমিদারবাড়ি আছে। স্ত্রী পুত্র নিয়ে সেখানেই বাস করতে যান তারা।

উপকথা থেকে প্রকাশিত ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’। এ ধারার গল্প বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ না। তবে গল্পটা পাঠক পড়বেন ওবায়েদ হকের লেখার কারণে। তার গদ্যের কারণে? না। ভাষা, বর্নণাভঙ্গি বা গল্প বুননের কারণে। ওবায়েদ হকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সহজ ভাষায় গল্প বলা। তিনি এমন ভাষায় গল্প বলেন যা তরতর করে পড়া যায়। থামার প্রয়োজন পড়ে না। সেই কারণেই ওবায়েদ হকের অতি সাধারণ গল্পও পাঠক পছন্দ করবেন। তার গল্পে যুক্তি বা ব্যাখ্যা খুঁজতে যাবেন না।

বর্তমান উপন্যাসে মায়ের মৃত্যুর পর বড়ো জমিদার বাড়িতে একাই বাস করে হাসান। এ বাড়িতে মহিমগঞ্জের কেউই যায় না। কেননা, সেখানে কোনো এক কালের জমিদারের ওপর অভিশাপ আছে এক নারীর। তাকে গর্ভবতী করে জমিদার দায়িত্ব নেয়নি। কুয়ায় ফেলে মেরে ফেলেছেন। পরিচিত গল্প। কিন্তু ভালো লাগে। আমরা পরিচিত গল্প শুনতেই পছন্দ করি।

অপরিচিত হয় কোনোভাবে তখন, যখন এ বাড়িতে হাসান একা বেড়ে ওঠে। তার বাবার সংগ্রহে থাকা প্রচুর বই সে পড়ে আর বেড়ে ওঠে নিজের মতো। এক সময় বাবাও তার মায়ের মৃত্যুতে নিজেকে অপরাধী মনে করে বাড়ি ছাড়লে হাসান একাই বাস করে। প্রায় কোনো মানুষের সংস্পর্শহীন—বৃক্ষ, লতা, শেয়াল, সাপ ও মেছোবাঘের সঙ্গে। এরপর সে মাছ ধরে, মুরগী পালে। মাঝে মাঝে বাজার গিয়ে সদায় করলে পরিচয় হয় মাওলানা ইখলাকের সঙ্গে। সাধারণত কারো লেখাকে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টা আমার অপছন্দ। তবে ইখলাকের চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের অনেক মাওলানা চরিত্রের সঙ্গেই মেলে।

লেখক ওবায়েদ হক

ইখলাকের হারিয়ে যাওয়া অবধি এ উপন্যাস যথেষ্ট সরল। ফ্যান্টাসি হলেও বিশ্বাসযোগ্য। উপন্যাস নাটকীয় হয়ে ওঠে হীরার আগমনে। শহুরে সেই মেয়ের অচেতন শরীর মেলে হাসানের জমিদার বড়ির সিঁড়িতে। সেই পর্যন্তও মেনে নেয়া যায়। আমরা মেনে নিতে পারি তার অতীত তথা ব্যাক স্টোরিও। গল্পটা ঝুলে যায়, হাসানকে যখন সে পাঠায় ঢাকায়, তার প্রেমিকের কাছে একটা চিঠি পৌঁছে দিতে।

ওবায়েদ হক একটা মায়াবী দুনিয়া তৈরি করতে চান। তার চরিত্রের প্রতি তার পাঠক স্নেহ, সহমর্মিতা অনুভব করবে। আর সেটা তৈরি করতে নাটকীয় মোড়, দুর্যোগ, দুর্ঘটনাময় গল্প তৈরি করেন লেখক। তার নীল পাহাড়, জলেশ্বরীতেও এই ফর্মুলা রয়েছে। জলেশ্বরীতে আছে একাধিক নাটকীয় মোড়। কিছু ক্ষেত্রে আশির দশকের সিনেমার মতোও বলা চলে। বর্তমান উপন্যাসে শাকের মাহমুদ সেই সিনেম্যাটিক উত্থান ও চরিত্রের উদাহরণ। তার সঙ্গে হাসানের দেখা থেকে পুরো অংশটাই অতিনাটকীয়। এই জায়গায় এসে উপন্যাসটি এর প্রথম ভাগের ইনোসেন্স কিছুটা হারায়।

তবে ওবায়েদ হক আমাদের মনে করিয়ে দেন বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের ক্ল্যাসিক ধারা। সেই ধারাতেও এরকম চরিত্র, আবেশ ও মায়া থাকত। প্রধান চরিত্রটির প্রতি পাঠকের তৈরি হতো মায়া। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা সেখানে যুক্ত করেন নাটকীয় কিছু মোড়। ডাকনাম ভুলে গেছি মনোযোগী পাঠককে এ সবই মনে করিয়ে দেবে।

আরও