প্রেম মানুষের জীবনে অন্যতম শক্তিশালী ও রহস্যময় অনুভূতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেম অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক সংবেদনশীল ঘটনা, যা আমাদের সমস্ত অনুভূতিকে নাড়া দেয় এবং মস্তিষ্কে অত্যন্ত গভীর ও রহস্যময় উপায়ে প্রভাব ফেলে।
গবেষকদের মতে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেম মূলত চারটি প্রধান ধাপ পার করে: এক. উন্মাদনা বা ইউফোরিয়া দুই. বন্ধন বা অ্যাটাচমেন্ট তিন. সংকট বা ক্রাইসিস ও চার. গভীর সংযুক্তি।
সম্পর্কের এ ধাপগুলোর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। প্রথম উন্মাদনার ধাপটি সাধারণত ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপর শুরু হয় প্রাথমিক বন্ধন। আর সম্পর্কের ৫ থেকে ৭ বছরের মাথায় গিয়ে সাধারণত প্রথম বড় ধরণের সংকট দেখা দেয়। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে সম্পর্কটি চূড়ান্ত ও গভীর সংযুক্তির ধাপে রূপ নেয়।
কেন বলা হয় প্রেম মাত্র দুই বছর স্থায়ী হয়?
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেমের তীব্রতা বা শুরুর ‘স্পার্ক’ (উত্তেজনা) সাধারণত দুই বছরের মতো স্থায়ী হয়। তীব্র আবেগ ও শারীরিক আকর্ষণ দুই বছর পর কমতে শুরু করে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, প্রেম শেষ হয়ে যায়। মূলত এরপর প্রেমের ধরন বদলে যায়। সম্পর্কের শুরুতে তীব্র শারীরিক আকর্ষণ, প্রবল উত্তেজনা ও সঙ্গীকে অন্ধের মতো ভালোবাসার প্রবণতা থাকে। একে বলা হয় কামনার প্রাথমিক ধাপ। এ সময়ে সুখ ও আনন্দের অনুভূতিগুলো তুঙ্গে থাকে। কিন্তু দুই বছর পর হরমোনের ঝড় শান্ত হয়ে এলে, কাপলরা বাস্তবতার মুখোমুখি হন। শুরু হয় একসঙ্গে থাকার আসল চ্যালেঞ্জ। একে অপরের মধ্যকার অমিলগুলো প্রকাশ পেতে থাকে, মনে জাগে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব। আর সেসময় প্রয়োজন হয় পরস্পরকে বোঝার মানসিকতা।
প্রেমের নেপথ্যে হরমোনের খেলা
আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরের লিম্বিক সিস্টেম—যা আমাদের স্মৃতি, ঘ্রাণ, আকর্ষণ ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে বেশ কিছু নিউরোট্রান্সমিটার ও হরমোন প্রেমের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ রাসায়নিকগুলো মানুষের ভেতরের ভীতি কমিয়ে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস বাড়ায়। প্রেমে প্রধান ভূমিকা পালন করে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন:
- অক্সিটোসিন: একে বলা হয় ‘লাভ হরমোন’। এটি সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে, পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়ায় এবং আকর্ষণকে দীর্ঘস্থায়ী করে। সম্পর্কের গভীরতা ধরে রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম।
- ভ্যাসোপ্রেসিন: নিরাপত্তা ও স্থায়ী বন্ধন তৈরি করাই ভ্যাসোপ্রেসিনের কাজ। এটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে সঙ্গীকে আগলে রাখতে সহায়তা করে।
- ডোপামিন: এটি ‘রিওয়ার্ড হরমোন’। ভালো খাবার, ব্যায়াম বা শারীরিক সম্পর্কের মতো যেকোনো আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতার সময় এটি নিঃসৃত হয়ে আমাদের প্রবল সুখের অনুভূতি দেয়।
- টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন: এগুলো মূলত কামোদ্দীপক হরমোন। এরা বংশবৃদ্ধি ও শারীরিক সম্পর্কের আদিম তাড়না ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- নরঅ্যাড্রেনালিন প্রেমে পড়ার শুরুর দিকে বুক ধড়ফড় করা, হাত কাঁপা বা অতিরিক্ত শক্তি পাওয়ার পেছনে দায়ী এ হরমোন। এটি মস্তিষ্কে স্মৃতি সংরক্ষণেও সাহায্য করে, যার কারণে মানুষ প্রেমের শুরুর দিনগুলোর কথা স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারে।
- সেরোটোনিন: আকর্ষণের নির্দিষ্ট কিছু ধাপে এ হরমোনের মাত্রা সাময়িকভাবে কমে যায়, যার ফলে মানুষ কিছুটা অবসেসিভ বা সারাক্ষণ সঙ্গীর চিন্তায় মগ্ন থাকে।
প্রেম কি কেবলই আবেগ?
বিজ্ঞান বলছে, প্রেম কেবল কবি-সাহিত্যিকদের কল্পনার বিলাসী কোনো অনুভূতি নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রেম মানুষের জন্য একটি জৈবিক প্রয়োজনীয়তা। একজন মানুষের সুস্থতার জন্য বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও ব্যায়াম যতটা জরুরি, প্রেমও ঠিক ততটাই অত্যাবশ্যক।"এটি আমাদের জিনের ভেতরেই প্রোথিত।
প্রাথমিক মোহ বা দুই বছরের তীব্র উত্তেজনা কমে যাওয়ার পর যখন সম্পর্কে সংকট আসে, তখনই মূলত আসল প্রেমের পরীক্ষা শুরু হয়। এ ‘কোপিং ফেজ’ বা মানিয়ে নেয়ার ধাপে যারা সফল হন, তারা কল্পনার জগত থেকে বের হয়ে বাস্তবতাকে মেনে নেন। তখন অন্ধ মোহ বা অন্ধ ভালোবাসার চেয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক স্নেহ অগ্রাধিকার পায়। এ ধাপেই প্রেম গভীর ও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।