কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে একেকটা দিন যেন অনন্তকাল। বাইরে প্রিয়জন, সংসার, সন্তান—সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন বন্দিদের কাছে সময় কাটানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বই পড়ার বিনিময়ে যদি সে সময় কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়, তাহলে কেমন হয়? ব্রাজিলের কারাগারগুলোয় বন্দিদের জন্য রয়েছে এমনই এক সুযোগ। সেখানে বই পড়ার মাধ্যমে কমানো যায় কারাদণ্ডের মেয়াদ।
ব্রাজিলের ৩৩ বছর বয়সী এমিলি দে সুজার কাছে বই পড়ার এ সুযোগ নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। মাদকমিশ্রিত ব্রাজিলীয় মিষ্টি ‘ব্রিগাদেইরো’ বিক্রির দায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে তার। নয় বছর বয়সী অটিজমে আক্রান্ত ছেলে ও পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি। সুজার ভাষায়, ‘এখানে প্রতিটা দিনই অনন্তকাল মনে হয়, যেন এ বন্দিদশা কখনো শেষ হবে না।’
কারাগারের দমবন্ধ পরিবেশ থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বেরিয়ে আসার উপায় হয়ে উঠেছে বই। অন্য গল্প, অন্য মানুষ আর ভিন্ন জগতে ঢুবে গিয়ে নিজের বন্দিজীবনের কথা কিছুটা হলেও ভুলে থাকেন এমিলি। বই পড়ে সাজা কমানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী আগস্টে ব্রাজিলের আধা-মুক্ত (সেমি-ওপেন) কারা ব্যবস্থায় যাওয়ার আশা করছেন তিনি। এ ব্যবস্থায় দিনের বেলায় কারাগারের বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়।
ব্রাজিলে কারাগারের ভেতরে বই পড়ে সাজা কমানোর কর্মসূচিটি বেশ সুসংগঠিত। নিয়ম অনুযায়ী, বন্দিরা পছন্দের বই বেছে নিয়ে তা পড়েন এবং বইটি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর পর্যালোচনা লিখে বা ছবি এঁকে জমা দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নে তা গ্রহণযোগ্য হলে প্রতিটি বইয়ের জন্য চার দিন করে সাজা কমে। এভাবে বছরে সর্বোচ্চ ৪৮ দিন পর্যন্ত সাজা মওকুফের সুযোগ রয়েছে। বন্দিদের পঠনতালিকায় রয়েছে ব্রাজিলের প্রখ্যাত লেখক হোর্হে আমাদোর ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য স্যান্ডস’, ফিওদর দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ কিংবা অ্যালিস ওয়াকারের ‘দ্য কালার পার্পল’-এর মতো বিশ্বসাহিত্যের ক্ল্যাসিক।
৫০ বছর বয়সী বন্দি সেলিনা মারিয়া দে কনসেইসাও গত বছর এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। এবারও তিনি কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। তার কথায়, কারাগারের কোলাহল ও মানসিক চাপের মধ্যে বই পড়লে অন্য এক জগতে যাওয়ার অনুভূতি হয়। পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা এবং বই নিয়ে ভালো কিছু আলোচনার সুযোগও তৈরি হয়।
তবে বই পড়ার মাধ্যমে সাজা কমানোর সুযোগ এখনো সব কারাগারে সমান নয়। দেশটির কোনো কোনো কারাগারে বন্দিদের হাতে ৩০০ বই সংরক্ষিত কিন্ডল ই-রিডার তুলে দেয়া হয়েছে। আবার কোথাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না বন্দিরা। ২০২৩ সালের এক সরকারি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রাজিলের প্রায় ৩০ শতাংশ কারাগারে কোনো পাঠাগার বা বই পড়ার উপযুক্ত জায়গা নেই। তা সত্ত্বেও গত পাঁচ বছরে বই পড়ার মাধ্যমে সাজা কমানোর আবেদন বেড়েছে সাত গুণ।
এ উদ্যোগ বন্দিদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রিও ডি জেনেইরোর কারাগারগুলোতে পাঠ কর্মশালা পরিচালনাকারী সাহিত্য অধ্যাপক পাওলো রবার্তো তোনানির মতে, বই বন্দিদের নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেয়। গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে এক ধরনের কথোপকথন তৈরি হয়, যা কারাগারের সীমাবদ্ধ পরিবেশের বাইরে অন্য জগতের সঙ্গে পরিচিত করে। পরবর্তী অপরাধ প্রবণতাও কমাতে পারে বই।
এপি অবলম্বনে