নিঃসঙ্গতা কোনো একক অনুভূতি নয়; এটি দুঃখ, রাগ, ঈর্ষার মতো নানা আবেগের সমষ্টি

ভিড়ের মধ্যেও একলা লাগে: প্রযুক্তিযুগে কেন বাড়ছে নিঃসঙ্গতা

বেশিরভাগ সময় বিয়েকে নিঃসঙ্গতার সমাধান মনে করা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, অর্ধ শতাব্দী সংসার করার পরও সঙ্গীর কাছে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ না পেয়ে মানুষ একাকীত্বে ভোগে। ভিড়ের মধ্যে, প্রেমের সম্পর্কে থেকে এমনকি বন্ধুদের মাঝেও নিঃসঙ্গ অনুভূত হয়

এক ব্যস্ত, জনাকীর্ণ পৃথিবীতে মানুষের বাস। চারপাশে মানুষ, শব্দ আর যোগাযোগের অগণিত মাধ্যম থাকা স্বত্ত্বেও নিঃসঙ্গতার অনুভূতি যেন বাড়ছেই। এখন প্রশ্ন হলো, এত সংযুক্ত এক সময়ে কেন মানুষ নিজেকে এত বিচ্ছিন্ন মনে করছে? আর এর থেকে বেরোনোর পথই বা কী?

নিঃসঙ্গতা আপেক্ষিক, প্রত্যেকে একে অনুভব করে ভিন্নভাবে। কারো কাছে নিঃসঙ্গতা মানে কোলাহল, হাসি-ঠাট্টা আর ভিড়ের মধ্যে থেকেও নিজেকে আগন্তুক অনুভব করা। কারো কাছে এটি সম্পর্কের দুর্বলতা—যেখানে কথা জমে যায়, প্রয়োজন পূরণ হয় না; প্রিয়জন আছে কিন্তু নেই অনুভূতি।

নিঃসন্দেহে দীর্ঘমেয়াদি একাকিত্ব ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। সাধারণভাবে মনে করা হয়, দূরত্ব বা শারীরিক বিচ্ছিন্নতাই নিঃসঙ্গতার প্রধান কারণ। তবে অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বলছে, মানুষ সব সময় নিঃসঙ্গতার প্রতিষেধক বা সমাধান নয়; অনেক সময় তারাই সমস্যার অংশ। অনেক সময় অন্যের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা, অভিমান, অভিযোগ নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়।

বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী স্যাম কার মনে করেন, অনেক সময় মানুষই নিঃসঙ্গতার কারণ। আমরা সবাই যেন ধাঁধার টুকরো; কোথাও গিয়ে না মিললে নিজেকে বেমানান লাগে। এমনকি বন্ধু বা সঙ্গীও যদি আমাদের প্রকৃত সত্তাকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যেই জন্ম নেয় নিঃসঙ্গতা।

বেশিরভাগ সময় বিয়েকে নিঃসঙ্গতার সমাধান মনে করা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, অর্ধ শতাব্দী সংসার করার পরও সঙ্গীর কাছে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ না পেয়ে মানুষ একাকীত্বে ভোগে। ভিড়ের মধ্যে, প্রেমের সম্পর্কে থেকে এমনকি বন্ধুদের মাঝেও নিঃসঙ্গ অনুভূত হয়। ২০২১ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় ৭৫৬ জন অংশগ্রহণকারী দুই বছর ধরে নিজেদের অনুভূতি নথিভুক্ত করেন। সেখানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বিশেষত আধুনিক শহরে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি বেড়ে যায়। অথচ প্রযুক্তির কারণে পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনের খুঁটিনাটি দেখা বা মুহূর্তেই দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়।

বিশ্বজুড়ে এখন ‘নিঃসঙ্গতার মহামারি’ নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০১৮ সালে বিবিসির লোনলিনেস এক্সপেরিমেন্ট-এ ৫৫ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৪০ শতাংশ প্রায়ই বা খুব ঘন ঘন নিঃসঙ্গ বোধ করে। অন্যান্য গবেষণা বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনোভাবে নিঃসঙ্গতায় ভোগেন।

লন্ডনের কিংস কলেজের ইতিহাসবিদ ফে বাউন্ড আলবার্টির মতে, নিঃসঙ্গতা কোনো একক অনুভূতি নয়; এটি দুঃখ, রাগ, ঈর্ষার মতো নানা আবেগের সমষ্টি। শারীরিক দূরত্ব নয়, বরং মানসিক দূরত্বই মানুষকে বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অলিভিয়া রেমেস বলেন, নিঃসঙ্গতা অনেকটাই নির্ভর করে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে কি না তার ওপর। কারো কাছে একজন মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্কই যথেষ্ট, আবার কেউ বহু মানুষের ভিড়েও গভীর সংযোগের অভাবে নিঃসঙ্গ বোধ করেন।

নিঃসঙ্গতা আমাদের মানবিক অস্তিত্বের সঙ্গেই জড়িত। বিবর্তনীয় দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের সতর্ক সংকেত। ক্ষুধা যেমন আমাদের খাবার খুঁজতে বাধ্য করে, তেমনি নিঃসঙ্গতা জানিয়ে দেয় আমাদের সামাজিক পরিবেশে কিছু একটা গোলমাল চলছে। আদিম যুগে একা থাকা ছিল বিপজ্জনক; তাই দল থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানুষের মস্তিষ্কে সতর্কতার অনুভূতি তৈরি হতো।

তবে ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার ধারণা বদলেছে। বাউন্ড আলবার্টির গবেষণা বলছে, ১৯ শতকের আগে ‘লোনলি’ মানে ছিল শুধু ‘একাকী’ বা ‘একটি’। তা নেতিবাচক ছিল না; বরং প্রকৃতি বা ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ হিসেবে দেখা হতো। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘লোনলি অ্যাজ অ্যা ক্লাউড’ কথাটিও সেই অর্থেই ব্যবহৃত। পরবর্তীকালে ধর্মীয় কাঠামোর দুর্বলতা, নগরায়ণ, পরিবার ও সম্প্রদায়ের বিচ্ছিন্নতা মানুষকে একলা করে তোলে।

তাহলে করণীয় কী?

প্রথমত, সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি নিঃসঙ্গতার পার্থক্য বুঝতে হবে। যদি নিঃসঙ্গতা দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্ক গঠনে বাধা দেয়, তাহলে পেশাদার সহায়তা নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে বুঝতে হবে—নিঃসঙ্গতা কি নিজের পছন্দ, নাকি বয়স, অসুস্থতা, দারিদ্র্য বা বৈষম্যের মতো কাঠামোগত কারণে চাপিয়ে দেয়া?

ব্যক্তিগত পর্যায়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা বোধ করি। অথচ গবেষণা বলছে, অচেনা মানুষের সঙ্গে সামান্য কথোপকথনও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যাতায়াতের পথে অপরিচিতের সঙ্গে সামান্য কথোপকথনেও মন হালকা হয়।

তবে নিঃসঙ্গতা দূর করা মানে শুধু বেশি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া নয়; অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলাই আসল। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, অন্যের পাশে দাঁড়ানো, এমনকি স্পর্শও সংযোগের অনুভূতি বাড়ায়। গবেষণা বলছে, সামান্য শারীরিক স্পর্শও একাকিত্ব কমাতে পারে। মানুষ ছাড়াও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ নিঃসঙ্গতা কমাতে কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরা ২৮ শতাংশ কম নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন।

এ কথাও মনে রাখতে হবে—কিছু সম্পর্কই নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়। এমন হলে খোলামেলা যোগাযোগ জরুরি। প্রয়োজন হলে সম্পর্ক ছাড়ার সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।

আরও