কখনো সবার সামনে ভুল করে ফেলেছেন? হয়তো কারো নাম ভুলে গেছেন। কিংবা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন কিছু বলেছেন, যা পরে বুঝেছেন একেবারেই ঠিক ছিল না। এমন মুহূর্তে কেউ হেসে ফেললে কেমন লাগে? অনেকেই অস্বস্তিতে পড়ে যান। কেউ রেগে যান। কেউ আবার চুপ করে সরে যেতে চান। কিন্তু কখনো কখনো নিজের ভুল নিয়ে নিজেই একটু হাসতে পারলে পরিস্থিতিটা অন্য রকম হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, নিজেকে নিয়ে হাসতে পারার মধ্যে মানসিক ও সামাজিক কিছু সুবিধা আছে। তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। নিজেকে নিয়ে কিছুটা রসিকতা করা আর নিজেকে ছোট করা এক বিষয় নয়।
শৈশব থেকেই শুরু
নিজেকে নিয়ে হাসতে পারা আমাদের সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখছিলেন, কেন কিছু শিশু সহপাঠীদের কাছে একঘরে হয়ে যায়। তারা দু-ধরনের শিশুর কথা জানতে পারেন। একদল ছিল আক্রমণাত্মক। অন্য দল ছিল খুবই চুপচাপ ও নির্ভরশীল। দুই দলের মধ্যে একটি মিল ছিল। তারা কেউই নিজেদের নিয়ে করা রসিকতা সহজভাবে নিতে পারত না।
কেউ ঠাট্টা করলে প্রথম দল রেগে যেত। কেউ কেউ আক্রমণাত্মকও হয়ে উঠত। আর দ্বিতীয় দল কষ্ট পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতো। অন্যদিকে, সামাজিকভাবে বেশি আত্মবিশ্বাসী শিশুরা ঠাট্টাকে সহজভাবে নিতে পারত। কেউ মজা করলে তারা হয় এড়িয়ে যেত, নয়তো নিজেরাও হেসে ফেলত। অর্থাৎ, নিজেকে নিয়ে অন্যের রসিকতা সহজভাবে নিতে পারার ক্ষমতা ছোটবেলা থেকেই সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিজেকে নিয়ে কি আসলেই হাসা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে অবশ্য দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো মনে করতেন, হাস্যরসের পেছনে অন্যের তুলনায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করার বিষয়টি কাজ করে। পরে দার্শনিক থমাস হবসও অনেকটা একই মত পোষণ করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে হাস্যরস নিয়ে মানুষের ধারণা বদলাতে থাকে। অনেক গবেষকরা সরাসরি মানুষকে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আপনি কি নিজেকে নিয়ে হাসতে পারেন?’ তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, মানুষ নিজের সম্পর্কে সব সময় নির্ভুল উত্তর দেয় না। ২০১১ সালে ইউরোপের একদল গবেষক তাই বিষয়টি পরীক্ষার মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করেন। অংশগ্রহণকারীদের মুখ গোপনে ভিডিও করা হয়। পরে তাদের মুখের বিকৃত ছবি দেখানো হয়।
ফলাফল ছিল বেশ মজার। ৮০ শতাংশ মানুষ ছবিটি দেখে অন্তত হেসেছিলেন। আর প্রায় ৪০ শতাংশ জোরে হেসে উঠেছিলেন। অর্থাৎ, নিজের অদ্ভুত বা হাস্যকর চেহারা দেখে নিজেরাও হাসতে পারেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এখন মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মানুষ নিজেকে নিয়ে হাসতে পারে। আর এর বেশ কিছু উপকারিতাও আছে।
তবে সবাই পারেন না
নিজেকে নিয়ে হাসতে পারা সবার জন্য সহজ নয়। কিছু মানুষ অন্যরা তাদের নিয়ে হাসছে—এমন ধারণাতেই খুব অস্বস্তি বোধ করেন। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে বলা হয় ‘জেলোটোফোবিয়া’। এমন মানুষের কাছে অন্যের হাসি সহজেই অপমান বলে মনে হতে পারে।
ধরুন, আপনি বন্ধুদের সঙ্গে বসে হাসছেন। পাশের কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। বেশির ভাগ মানুষ হয়তো বিষয়টি গুরুত্ব দেবেন না। কিন্তু জেলোটোফোবিয়ায় ভোগা কেউ ভাবতে পারেন, ‘ও কি আমাকে নিয়ে হাসছে?’
এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। ছোটবেলায় খুব কঠোর শাসনের মধ্য দিয়ে বড় হওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে। তাছড়া শৈশবে দীর্ঘদিন ধরে উপহাস বা বুলিংয়ের শিকার হওয়াও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এর প্রভাবও কম নয়। গবেষণায় এমন মানুষের মধ্যে কম জীবনসন্তুষ্টি, বন্ধুত্ব এড়িয়ে চলা, একাকিত্ব ও বিষণ্নতার মতো সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাহলে নিজেকে নিয়ে হাস্যরস করা কি ভালো?
এখানেই বিষয়টি একটু জটিল। ২০০৩ সালে কানাডার গবেষকেরা মানুষের হাস্যরসের ধরন বোঝার জন্য একটি প্রশ্নমালা তৈরি করেন। সেখানে হাস্যরসকে চার ভাগে ভাগ করা হয়।
এর মধ্যে একটি হলো নিজেকে ভালো রাখার জন্য রসিকতা করা। আরেকটি হলো নিজের দুর্বলতা, ভুল বা ত্রুটি নিয়ে মজা করা। দ্বিতীয় ধরনটিকে দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হতো। ধারণাটি ছিল, যারা বারবার নিজের দুর্বলতা নিয়ে মজা করেন, তারা হয়তো নিজেদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
তবে পরবর্তী গবেষণাগুলোয় ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব প্লাইমাউথের মনোবিজ্ঞানের লেকচারার সোনজা হেইন্টজ এ বিষয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, নিজের দুর্বলতা নিয়ে মজা করা মানুষদের সবাই কম আত্মসম্মান বা খারাপ মানসিক অবস্থায় থাকেন না। বরং তার গবেষণায় এমন মানুষের মধ্যে বেশি আত্মসম্মান ও ভালো সামাজিক সম্পর্কও দেখা গেছে।
অনেক অংশগ্রহণকারী বলেছেন, নিজেকে নিয়ে নিজের হাস্যরস তাদের কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও এটি কাজে লাগে।
আসল পার্থক্যটা কোথায়?
নিজেকে নিয়ে হাসা ভালো না খারাপ—এর কোন সরল উত্তর নেই। মূল বিষয় হলো, কেন আপনি নিজেকে নিয়ে মজা করছেন। আপনি যদি কোনো ভুলকে মেনে নিয়ে সেটি নিয়ে হালকা রসিকতা করেন, তাহলে বিষয়টি এক রকম। কিন্তু নিজের প্রতি রাগ, তিক্ততা বা ঘৃণা থেকে যদি বারবার নিজেকে ছোট করেন, তাহলে তা অন্য রকম।
গবেষকদের মতে, নিজের দুর্বলতা নিয়ে মজা করার সময় একধরনের স্বস্তি থাকা প্রয়োজন। ধরুন, রান্না করতে গিয়ে খাবারে একটু বেশি লবণ দিয়েছেন। সেটি নিয়ে হেসে বলতে পারেন, ‘আজ মনে হয় লবণের কৌটাটা আমাকে বেশি পছন্দ করেছে।’ এটি এক ধরনের হালকা রসিকতা।
কিন্তু যদি বলেন, ‘আমি তো কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারি না’, তাহলে সেটি আর নিছক রসিকতা থাকে না। সেখানে নিজের প্রতি নেতিবাচক ধারণাও চলে আসতে পারে। অর্থাৎ, নিজেকে নিয়ে হাসা আর নিজেকে অপমান করার মধ্যে পার্থক্য আছে।
ভুল হলে হাসতে পারা কেন কাজে দেয়?
জীবনে ভুল হবেই। কখনো কাজ নষ্ট হবে। কখনো পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। কখনো নিজেরই কোনো আচরণ পরে মনে হবে বেশ হাস্যকর ছিল। এসব মুহূর্তে রাগ বা হতাশার বদলে একটু হেসে নিতে পারা পরিস্থিতিকে অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করতে পারে।
নিজের ভুল নিয়ে হাসতে পারা কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতেও সাহায্য করে। এমনকি অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময়ও নিজেকে নিয়ে হালকা রসিকতা করা বেশ কাজে আসতে পারে। কারণ তখনো আপনি জানেন না, সামনের মানুষটির রসবোধ কেমন। অন্য কাউকে নিয়ে মজা করা ঝুঁকিপূর্ণ। ভুল বোঝাবুঝিও হতে পারে। এক্ষেত্রে নিজের কোনো ছোটখাটো ভুল নিয়ে রসিকতা করা তুলনামূলক নিরাপদ উপায় হতে পারে।
কাজের জায়গাতেও এর প্রভাব দেখা যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষকরা নিজেদের ছোটখাটো ভুল নিয়ে হালকা রসিকতা করলে শিক্ষার্থীদের চোখে তাদের আরো বন্ধুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক মনে হতে পারে। তবে সেই ভুল যেন অন্যের ক্ষতি না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতে পারা অনেক সময় আপনাকে দুর্বল নয়, বরং আরো সহজ-স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবেই তুলে ধরতে পারে।
বাড়াবাড়ি নয়
এখানেও সীমা আছে। নিজের প্রতিটি ভুল নিয়ে মজা করা দরকার নেই। নিজের প্রতিটি দুর্বলতাকে হাসির বিষয় বানানোরও প্রয়োজন নেই। গবেষকদের মতে, আত্ম-বিদ্রূপ কখন সমস্যার দিকে যাচ্ছে, তার একটি বড় ইঙ্গিত হলো বাড়াবাড়ি। বিশেষ করে নিজের প্রতি ঘৃণা বা তিক্ততা থেকে তৈরি রসিকতা ভালো ফল নাও দিতে পারে।
তাই নিজেকে নিয়ে হাসতে চাইলে প্রথমে নিজের ভুল নিয়ে কঠোর না হওয়া প্রয়োজন। যে বিষয়টি নিয়ে আপনি মজা করছেন, সেটি নিয়ে আপনি যদি ভেতরে ভেতরে খুব কষ্টে থাকেন, তাহলে সেই রসিকতা অন্যদেরও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
কীভাবে একটু হালকা হওয়া যায়?
সব সময় নিজের দুর্বল জায়গা নিয়ে মজা করতে হবে—এমন নয়। বরং শুরুটা আরো সহজভাবে করা যায়। মনোবিজ্ঞানী রেনে প্রোয়ারের একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এক সপ্তাহ প্রতিদিনের মজাদার বা আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলো লিখে রাখতে বলা হয়েছিল। সময় লাগত মাত্র ১০ মিনিট।
দিনে এমন তিনটি বিষয় লিখতে বলা হয়েছিল, যেগুলো তাদের কাছে মজার বা উপভোগ্য লেগেছে। সেটি হতে পারে নিজের কোনো ভাবনা। হতে পারে পথে দেখা কোনো ঘটনা। এমনকি কোনো সাধারণ কাজও।
গবেষণায় দেখা যায়, এই ছোট্ট অনুশীলনের পর অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের আরো খেলাচ্ছলে বা হালকা মনের মানুষ হিসেবে ভেবেছিলেন। কয়েক মাস পরও এর প্রভাব কিছুটা ছিল। তারা কম বিষণ্নতা ও বেশি সুখের অনুভূতির কথাও জানিয়েছেন।
তাই নিজের ছোটখাটো ভুলগুলো একটু হালকাভাবে নেয়াই ভালো। আজকের দিনের সবচেয়ে মজার ঘটনাটা কী ছিল? কাজের ফাঁকে একটু ভেবে দেখুন। হয়তো নিজের কোনো ভুল। অথবা বন্ধুর কোনো কথা। কিংবা এমন কোনো ছোট্ট ঘটনা, যেটা অন্য কেউ হয়তো খেয়ালই করেনি। নিজেকে সব সময় নিখুঁত হতে হবে—এমন নয়। তাই ভুলগুলো মনে করেই একটু হাসুন।
বিবিসি অবলম্বনে