সপ্তাহজুড়ে কাজ, পড়াশোনা কিংবা নানা ব্যস্ততায় অনেক সময় ঠিকমতো ঘুমানোর সুযোগই হয়ে ওঠে না। শুক্রবার বা শনিবার ছুটির দিনে তাই একটু বেশি ঘুমানোর সুযোগ পেলেই মনে হয়, এতদিনের ঘুমের ঘাটতি এবার বুঝি পুষিয়ে নেয়া যায়।
অনেকের কাছে এটি বেশ পরিচিত অভ্যাস। কর্মদিবসে ভোরে ওঠার তাড়া থাকলেও ছুটির দিনে অ্যালার্ম বন্ধ করে আরো দুয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নেয়া। কেউ আবার আগের রাতে তাড়াতাড়ি বিছানায় যাওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু ঘুমের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে বেশি ঘুমানো কি সবসময় ভালো? নাকি ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমের কারণে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দই কিছুটা এলোমেলো হয়ে যেতে পারে?
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এক রাত খুব কম ঘুম হলে পরের রাতে কিছুটা বেশি ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের সে ঘাটতি কিছুটা কমাতে পারে। তবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুম কম হলে শুধু ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে সবটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
ছুটির দিনে বাড়তি ঘুম কি সবসময় উপকারি?
ঘুম নিয়ন্ত্রণে শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা কাজ করে। এর একটি হলো ‘স্লিপ হোমিওস্ট্যাট’। সহজভাবে বললে, এটি শরীরের ঘুমের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা যত বেশি সময় জেগে থাকি, ততই ঘুমের চাপ বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে আছে শরীরের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা দৈনিক জৈবঘড়ি। আলো-অন্ধকার, শরীরের তাপমাত্রা, খাওয়া ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের মতো বিষয় এই ছন্দকে প্রভাবিত করে।
দুই ব্যবস্থাই মূলত কখন ঘুম পাবে এবং কখন জেগে থাকতে হবে, তা শরীরকে বুঝতে সাহায্য করে। সমস্যা হতে পারে ছুটির দিনে ঘুমের সময় হঠাৎ অনেকটা বদলে গেলে। ধরুন, সপ্তাহের অন্য দিনগুলোয় সকাল ৬টায় উঠতে হয়। কিন্তু ছুটির দিনে সকাল ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত ঘুমালেন। এতে দিনের পরে ঘুমের তাগিদ কমে যেতে পারে। ফলে রাতে আগের সময়টায় ঘুম নাও আসতে পারে। এর পর রোববার রাতে দেরিতে ঘুমিয়ে সোমবার সকালে আবার ৬টায় উঠতে হলে ঘুমের ঘাটতি নতুন করে শুরু হতে পারে।
তাহলে কি বাড়তি ঘুম একেবারেই ভালো নয়?
বাড়তি ঘুম শরীরের জন্য একেবারেই যে ভালো নয়, বিষয়টি এমন নয়। বরং কোনো কোনো পরিস্থিতিতে বাড়তি ঘুম উপকারী হতে পারে। গবেষণাগারে করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক রাত খুব কম ঘুমের পর পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর সুযোগ পেলে শরীরের কিছু পরিবর্তন আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে আসতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা যায়, এক রাত মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তিদের শরীরে নির্দিষ্ট কিছু শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা বেড়েছিল। এতে বোঝা যায়, ঘুমের ঘাটতি শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় অংশ নেয়া ব্যক্তিদের পরের রাতে আট ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ দেয়া হলেও আগে হওয়া পরিবর্তন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমানোর সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
আরেকটি গবেষণায় স্বাভাবিকভাবে রাতে আট ঘণ্টা ঘুমানো ১১ জন পুরুষকে টানা ছয় রাত মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতে দেয়া হয়। এতে শরীরের গ্লুকোজ ব্যবহারের ক্ষমতা ও ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখা যায়। এর পর ছয় রাত ১২ ঘণ্টা করে ঘুমানোর সুযোগ দিলে এসব পরিমাণ আবার আগের মাত্রায় ফিরে আসে।
তবে অন্য অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা রাত না ঘুমানোর পর পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের কিছু কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ, এক-দুই রাতের ঘুমের ঘাটতি হলে পরের দিকে কিছুটা বেশি ঘুম শরীরের জন্য একেবারেই অর্থহীন—এমনও নয়।
তবে নিয়মিত কম ঘুমানোর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে
মাঝে মধ্যে এক রাত কম ঘুমানো আর নিয়মিত কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস কম ঘুমানো এক বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ঘুম কম হলে মনোযোগ ধরে রাখা, দ্রুত সাড়া দেয়া এবং দিক ও অবস্থান বুঝতে পারার মতো কিছু ক্ষমতা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মদিবসগুলোয় নিয়মিত কম ঘুমানোর পর শুধু সপ্তাহ শেষে বেশি ঘুমালেও এসব প্রভাব পুরোপুরি দূর নাও হতে পারে।
তাই ছুটির দিনে কয়েক ঘণ্টা বেশি ঘুমানোকে পুরো সপ্তাহের কম ঘুমের বিকল্প হিসেবে ভাবা ঠিক হবে না বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণার ফলাফল কি বাস্তব জীবনের সঙ্গে মেলে?
ল্যাবরেটরির গবেষণার বাইরে বাস্তব জীবনেও ঘুমের সঙ্গে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সুইডেনে ৪০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৬৫ বছরের কম বয়সী যারা নিয়মিত রাতে পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি ছিল।
তবে এ গবেষণায় আরেকটি দিকও উঠে আসে। যারা সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোয় কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে তা কিছুটা পুষিয়ে নিতেন, তাদের ক্ষেত্রে এ বাড়তি ঝুঁকি দেখা যায়নি।
যদিও সব গবেষণায় একই ফলাফল পাওয়া যায়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক গবেষণায় সপ্তাহ শেষে বাড়তি ঘুমের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বা হৃদরোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে বেশি ঘুমানোর কারণে ঝুঁকি বেড়েছে—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
কতটা বাড়তি ঘুম যথেষ্ট?
ছুটির দিনে তাহলে কতক্ষণ বেশি ঘুমানো যেতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তরে গবেষণাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো এক-দুই ঘণ্টার মতো বাড়তি ঘুম অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু গবেষণায় সপ্তাহ শেষে বাড়তি ঘুমের সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এছাড়া নিয়মিত কম ঘুমানো প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে প্রদাহের লক্ষণের সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তরুণদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কম থাকার সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছিলেন গবেষকরা।
যদিও সপ্তাহ শেষে এক-দুই ঘণ্টা বেশি ঘুমালেই মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এড়ানো যাবে—তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং এটি ঘুমের ঘাটতি সামলানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ঘুমের ক্ষেত্রে ভারসাম্যটাই গুরুত্বপূর্ণ
সপ্তাহজুড়ে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুমানোকে নিয়মিত অভ্যাস বানানো খুব একটা ভালো কৌশল নয়। এতে শরীরের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ কিছুটা এলোমেলো হতে পারে।
আবার খুব খারাপ একটি রাত কাটানোর পর পরদিন বা পরের রাতে কিছুটা বেশি ঘুমানোর প্রয়োজন হলে সেটিকে অস্বাভাবিক ভাবারও কারণ নেই।
বিশেষ করে ঘুমের ঘাটতি যদি মাঝে মধ্যে হয়, তাহলে শরীরকে বাড়তি বিশ্রামের সুযোগ দেয়া উপকারী হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের ঘুমের ঘাটতি মেটাতে শুধু ছুটির দিনের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আর যাদের অনিদ্রার মতো সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। অনিদ্রার চিকিৎসায় অনেক সময় আগেভাগে বিছানায় যাওয়া বা সকালে বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকার বদলে নির্দিষ্ট ঘুমের সময় মেনে চলার পরামর্শ দেয়া হয়। কারণ অতিরিক্ত সময় বিছানায় থাকা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।
বিবিসি অবলম্বনে