সাজগোজ: বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তার প্রাকৃতিক প্রতিষেধক

বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা মানুষকে এক ধরনের অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেয়। মনে হয় জীবনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সাইকোথেরাপিস্ট স্টেফানি বাউচারের মতে, প্রতিদিন সকালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সাজগোজের একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা অবিন্যস্ত জীবনে স্থায়িত্বের অনুভূতি এনে দেয়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে

চোখে একটু লাইনারের টান, পাপড়িতে মাসকারার ছোঁয়া আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক—অনেকের কাছে সাজগোজ কেবলই বাহ্যিক রূপচর্চা। কিন্তু মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষকরা বলছেন, বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের মতো কঠিন সময়ে, যখন নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, তখন রোজকার মেকআপ রুটিনটিই হয়ে উঠতে পারে মানসিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রকাশের হাতিয়ার।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘ডার্মাটোলজি অ্যান্ড থেরাপি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পরিমিত মেকআপের অভ্যাস মানুষের বিষণ্নতার লক্ষণগুলো কমিয়ে আত্মমর্যাদাবোধ বাড়াতে সাহায্য করে।

মেকআপ যেভাবে থেরাপির মতো কাজ করে

জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনে: বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা মানুষকে এক ধরনের অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেয়। মনে হয় জীবনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সাইকোথেরাপিস্ট স্টেফানি বাউচারের মতে, প্রতিদিন সকালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সাজগোজের একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা অবিন্যস্ত জীবনে স্থায়িত্বের অনুভূতি এনে দেয়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।

আত্মমর্যাদাবোধ বাড়ায়: ডিপ্রেশন মানুষকে নিজের যত্ন নেয়ার কথা ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু মেকাপের মতো ভালো লাগা ও ভালো দেখানোর সচেতন চেষ্টাটি মস্তিস্কে শক্তিশালী বার্তা পাঠায়—‘আমি মূল্যবান’। নিজের প্রতি এ ভালোবাসা ও মনোযোগ একসময় হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মানবোধ ফিরিয়ে আনে।

ভাষা ছাড়া সৃজনশীল প্রকাশ: থেরাপিস্ট বাউচারের মতে, সৃজনশীলতা কোনো শব্দ ছাড়াই মনের আবেগকে মুক্তি দিতে পারে। নানারকম রঙ, টেক্সচার বা প্রসাধনী নিয়ে করা এক্সপেরিমেন্ট মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে, নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে করা সাজটি নিয়ে বাইরে না গেলেও সেটি এক ধরনের মানসিক মুক্তি দেয়।

সামাজিক জড়তা কাটানো: ডিপ্রেশনের কারণে অনেকেই মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় পান বা গুটিয়ে থাকেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মিকি লি এলেমব্যাবির মতে, একটু পরিপাটি সাজগোজ মানুষকে মানসিকভাবে প্রস্তুত বোধ করায়। এছাড়া মেকআপের চলতি ট্রেন্ডগুলো অনেক সময় অপরিচিতদের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করার ‘আইসব্রেকার’ হিসেবে কাজ করে।

মন ভালো করার মনস্তাত্ত্বিক দাওয়াই: বিষণ্নতা মানুষের অনুভূতিগুলোকে অসাড় করে দেয়। মেকআপ করার সময় ব্রাশের ছোঁয়া বা প্রসাধনীর সুবাস পঞ্চেন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তোলে। এর ধীর, পরিমিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক ধাপগুলো মানুষকে বর্তমান মুহূর্তে ধরে রাখে। সুগন্ধ, স্পর্শ ও রঙের এ অনুভূতিগুলো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনকে শান্ত করতে ‘মেডিটেশন’-এর মতো কাজ করে। সেইসঙ্গে মেকআপের মতো একটি আনন্দদায়ক কাজে অংশ নিলে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ সক্রিয় হয়। ফলে ডোপামিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয়, যা মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়।

যেভাবে মেকআপের অভ্যাস শুরু করবেন

বিশেষজ্ঞরা মেকআপকে সেলফ-কেয়ার বা নিজের যত্নের অংশ বানানোর ৪টি সহজ উপায় বাতলে দিয়েছেন—

  • অল্প থেকে শুরু করুন: শুরুতেই ভারী মেকআপের দরকার নেই। কেবল একটি লিপবাম বা কাজল দিয়ে শুরু করুন। প্রসাধনীটি এমন জায়গায় রাখুন যা সহজেই চোখে পড়ে।
  • সহজ রাখুন: পুরো প্রক্রিয়াটির অনুভূতি উপভোগ করুন। এমন মাল্টিটাস্কিং পণ্য ব্যবহার করুন যা একইসঙ্গে ময়েশ্চারাইজার ও ফাউন্ডেশনের কাজ করে।
  • অভ্যাসের ওপর অভ্যাস: আগের কোনো অভ্যাসের সঙ্গে এটিকে জুড়ে দিন। যেমন—সকালে দাঁত ব্রাশ করার ঠিক পরপরই একটু সাজগোজ করে নেয়া।
  • প্রক্রিয়াটিকে আরামদায়ক করুন: মেকআপ করার সময় আপনার প্রিয় কোনো গান, কবিতা বা পডকাস্ট শুনতে পারেন।

তবে মনে রাখতে হবে, মেকআপ মন ভালো রাখার ও নিজের যত্ন নেয়ার একটি দারুণ অনুষঙ্গ, তবে এটি কোনোভাবেই পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ বা থেরাপির বিকল্প নয়। বিষণ্নতা তীব্র হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয়া উচিত।

ভেরিওয়েল মাইন্ড অবলম্বনে

আরও