ধোঁয়া-ওঠা এক থালা গরম ভাত, ওপরে ছড়িয়ে দেয়া একটুখানি ঘি, সঙ্গে একটু ডাল আর ভর্তা—বাঙালির কাছে এর চেয়ে তৃপ্তিদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে! সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি কিংবা অফিসে থেকে ফিরে এ এক থালা ভাতই যেন সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়। ভাতের ঘ্রাণ পেলেই মন ও মস্তিষ্ক আপনাআপনি শান্ত হয়ে আসে।
তবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য সচেতনরা ‘ডায়েট’-এর নামে খাদ্য তালিকা থেকে ভাত বা রুটিকে বাদ দিচ্ছেন! তাদের ধারণা ওজন কমানো বা ফিট থাকার পথে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাই সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু কয়েক দিন ভাত না খেলেই মাথা ঘোরে, কাজের গতি কমে যায়, মেজাজ খিটখিটে হতে শুরু করে। কেন এমন হয়? ভাত, রুটি বা শর্করার প্রতি আমাদের এ অদম্য টান কি শুধুই দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস নাকি এর পেছনে রেয়েছে কোনো বিজ্ঞান বা বির্বতনীয় ইতিহাস?
বিজ্ঞান বলে ভাতের প্রতি এ দুর্বলতা আমাদের রক্তে মিশে আছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সাইন্স’-এ প্রকাশিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষ কৃষিকাজ শেখার অনেক আগেই শ্বেতসার বা স্টার্চ হজম করার ক্ষমতা অর্জন করেছিল। আমাদের লালাগ্রন্তিতে ‘এএমওয়াই১’ নামের একটি জিন থাকে, যা শ্বেতসার হজমকারী এনজাইম বা ‘অ্যামাইলেজ’ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, আজ থেকে প্রায় ৮ লাখ বছর আগে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ-তে এ জিনের ডুপ্লিকেট বা অনুলিপি তৈরি হওয়া শুরু হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের শরীরে এ জিনের অনুলিপি যত বেশি ছিল, তারা তত সহজে শর্করা জাতীয় খাবার সহজে হজম করে দ্রুত শক্তি তৈরি করতে পারতেন। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার রসদ যোগাড় করতেন ভাত থেকে। যুগের পর যুগ ধরে বংশপরম্পরায় তাদের সে গুণটিই আমাদের শরীরে চলে এসেছে। তাই ভাত বা রুটির প্রতি দুর্বলতা কেবল লোভ বা বাজে অভ্যাস নয়; এটি মূলত লক্ষ বছর ধরে আমাদের শরীরে বয়ে চলা বেঁচে থাকার এক বৈজ্ঞানিক সংকেত!
যুক্তরাষ্ট্রের পুষ্টিবিদ তেরেসা ইউরি কার্বোহাইড্রেটকে গাড়ির ইঞ্জিনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। জ্বালানি ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি কার্বোহাইড্রেট ছাড়াও মানুষের শরীর অলস হয়ে পড়ে। কার্বোহাইড্রেট ভেঙে শরীর ‘গ্লুকোজ’ তৈরি করে, যা আমাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান ও সবচেয়ে পছন্দের খাবার। তাই হঠাৎ ভাত বা রুটি খাওয়া বন্ধ করে দিলে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত জ্বালানি পায় না। ফলে মাথা ঘোরা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কাজের গতি কমে যায় এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি গ্রাস করে।
শুধু শারীরিক শক্তিই নয়, কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়। হরমোনটি মানুষকে মানসিকভাবে প্রফুল্ল ও দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে সাহায্য করে। সারাদিন কাজ শেষে এক থালা গরম ভাত খেলে আমরা যে তৃপ্তি পাই, তার পেছনে মূলত এ রসায়নের অবদান রয়েছে। খাদ্যাভাস থেকে কার্বোহাইড্রেট সম্পূর্ণ বাদ দিলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা মানুষকে বিষণ্ণ ও অস্থির করে তোলে।
তবে ইচ্ছেমতো ভাত-রুটি বা মিষ্টি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিজ্ঞান বলছে, কার্বোহাইড্রেটের ধরন বুঝে খাওয়াটাই আসল সচেতনতা। চিনি, কোল্ড ড্রিংকস, কেক, প্যাকেটজাত চিপস, অতিরিক্ত পলিশ করা ধবধবে সাদা চাল পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট। যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেয়, দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর দ্বিগুণ খিদে ও ওজন বাড়ায়। অন্যদিকে লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ওটস, মিষ্টি আলু, ডাল ও বিভিন্ন শাকসবজিকে বলা হয় জটিল কার্বোহাইড্রেট। এ খাবারগুলো ধীরে হজম হয়। রক্তে গ্লুকোজের সামঞ্জস্য বজায় রাখে এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে শক্তি জোগায়।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, ফিট থাকতে ভাত বা শর্করা বাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সঠিক পরিমাণে সঠিক শর্করা নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাদের পরামর্শ—
- ভাত পুরোপুরি না ছেড়ে ভাত খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমানো যেতে পারে। সম্ভব হলে পরিশোধিত চালের বদলে লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি খাওয়া শুরু করুন। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে, যা হজম ধীর করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- দুপুর বা রাতের খাবারের প্লেটের অর্ধেক অংশ জুড়ে রাখুন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও সালাদ, এক-চতুর্থাংশ অংশ পূরণ করুন মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল (প্রোটিন) দিয়ে, আর বাকি এক-চতুর্থাংশ অংশে রাখুন ভাত বা রুটি।
- শুধু ভাত বা শুধু শর্করাজাতীয় খাবার না খেয়ে তার সাথে ভালো প্রোটিন এবং অল্প পরিমাণে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (যেমন: বাদাম, খাঁটি সরিষার তেল বা অলিভ অয়েল) যোগ করুন। এতে পাকস্থলীতে খাবার অনেকক্ষণ থাকে এবং বারবার খিদে পাওয়ার প্রবণতা কমে।
ইউনিভার্সিটি অফ বাফেলো, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ ও সিএনএন থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে।