নিয়মিত মাউথওয়াশ ব্যবহারে পরিচ্ছন্নতা নাকি স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, যা বলছে গবেষণা

গবেষকদের মতে, দাঁতের ক্যাভিটি প্রতিরোধ বা মুখের দুর্গন্ধের স্থায়ী চিকিৎসায় সাধারণ টুথব্রাশের চেয়ে মাউথওয়াশ বেশি কার্যকর—এমন শক্তিশালী প্রমাণ মিলেনি। উল্টো কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে ক্যান্সারের ঝুঁকিও থেকে যায়

প্রতিদিন সকালে দাঁত ব্রাশ করার পর কিংবা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচি করা অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। দুর্গন্ধ দূর ও মুখে সতেজ অনুভূতি আনার সহজ উপায় হিসেবে ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও এটি ব্যবহার করেন। অনেকে ভাবেন, এটি দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক গবেষণায় দন্ত চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে মাউথওয়াশের নিয়মিত ব্যবহার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

গবেষকদের মতে, দাঁতের ক্যাভিটি প্রতিরোধ বা মুখের দুর্গন্ধের স্থায়ী চিকিৎসায় সাধারণ টুথব্রাশের চেয়ে মাউথওয়াশ বেশি কার্যকর—এমন শক্তিশালী প্রমাণ মিলেনি। উল্টো কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে ক্যান্সারের ঝুঁকিও থেকে যায়।

যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো ডেন্টাল স্কুলের অধ্যাপক ড. ডেভিড কনওয়ের মতে, মুখ গহ্বরে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া বাস করে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। মাউথওয়াশ ব্যবহারের ফলে ভালো ও খারাপ—দুই ধরনের ব্যাকটেরিয়াই ধ্বংস হয়ে যায়, যাকে বলা হয় মাইক্রোবায়োম বিঘ্নিত হওয়া।

২০২০ সালে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শক্তিশালী অ্যান্টিসেপ্টিকযুক্ত (যেমন ক্লোরহেক্সিডিন) মাউথওয়াশ মাত্র সাত দিন ব্যবহার করলেই লালার ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয় এবং রক্তচাপ সামান্য বৃদ্ধি পায়। এমনকি যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, মাত্র তিন দিনের মাউথওয়াশ ব্যবহারে তাদের রক্তচাপ আরো বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তা হৃদরোগের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। বাজারে প্রচলিত অনেক মাউথওয়াশে প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত অ্যালকোহল থাকে, যা ব্যাকটেরিয়া মারতে সাহায্য করলেও অ্যালকোহল নিজেই একটি স্বীকৃত কার্সিনোজেন বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান। ২০১৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা দিনে তিনবারের বেশি অ্যালকোহলযুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করেন, তাদের মুখ ও গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

সাধারণত বাজারে দুই ধরনের মাউথওয়াশ পাওয়া যায়—কসমেটিক ও থেরাপিউটিক। কসমেটিক মাউথওয়াশ কেবল সাময়িকভাবে দুর্গন্ধ ঢেকে রাখে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান করে না। ব্রিটিশ ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ড. প্রবীণ শর্মার মতে, মাড়ির রোগের কারণে মুখে দুর্গন্ধ হলে মাউথওয়াশ ব্যবহার করা অনেকটা দুর্গন্ধযুক্ত ঘরে এয়ার ফ্রেশনার ছিটানোর মতো—যা মূল কারণ দূর না করে শুধু উপসর্গকে আড়াল করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখে সঠিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দিনে অন্তত দুবার ভালোভাবে ব্রাশ করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। টুথব্রাশের যান্ত্রিক ঘর্ষণ দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবার ও ব্যাকটেরিয়া দূর করে এবং টুথপেস্টের ফেনা ফ্লোরাইডকে দাঁতের এনামেলের সঙ্গে ভালোভাবে আটকে থাকতে সাহায্য করে।

ডেইলি মেইল অবলম্বনে

আরও