বাঙালি রান্নার চিরচেনা ছকে হঠাৎ করেই বড়সড় বদল এসেছে। তেল-মসলাপূর্ণ মাখো মাখো তরকারির জায়গা দখল করে নিচ্ছে ঝাল ঝাল শুটকি ভর্তা আর লবণ-পানিতে সেদ্ধ করা বাহারি সবজি। আজকাল ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবের স্ক্রল ডাউন করলেই চোখে পড়ছে সেদ্ধ সবজি আর মরিচ-পেঁয়াজে মাখানো ঝাঁঝালো ‘মরিচ ভর্তা’ কিংবা ‘শুঁটকি ভর্তা’র ভিডিও। কোনো রকম তেল ছাড়া, নামমাত্র মসলায় তৈরি এ পাহাড়ি খাদ্যাভ্যাস এখন সমতলের ভোজনরসিকদের টাইমলাইনে রীতিমতো রাজত্ব করছে। বিশেষ করে ফুড ব্লগার ও লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সারদের হাত ধরে সাধারণ এ পাহাড়ি খাবার এখন শহুরে ডায়েট চার্টেও অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে।
ব্লগের হাত ধরে সমতলে পাহাড়ি স্বাদ
পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের রান্নার মূল বৈশিষ্ট্য তেল-মসলা ছাড়া টাটকা সবজি সেদ্ধ। পাহাড়ে এটি নিত্যদিনের স্বাভাবিক খাবার হলেও সমতলের মানুষের কাছে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ফুড ব্লগাররা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি বা বান্দরবানের দূরবর্তী অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রান্নার প্রক্রিয়া ক্যামেরাবন্দী করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। বিশেষ করে বাঁশের কোঁড়ল, পাহাড়ি আলু, কাঁচকলা, মিষ্টি কুমড়ো পাতা আর বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় শাকসবজি একসঙ্গে সেদ্ধ করে তৈরি করা স্যুপ বা ‘সেদ্ধ সবজি’ এবং শুঁটকি ও মরিচের ভর্তা নেটিজেনদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ প্রচারণাই মূলত শহুরে তরুণ ও স্বাস্থ্যসচেতনদের মাঝে খাবারটির ক্রেজ তৈরি করেছে।
খাদ্যাভ্যাসের এ পরিবর্তনের নেপথ্যে কী?
খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জনপ্রিয়তার নেপথ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অতিরিক্ত তেল, কৃত্রিম রং আর অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করে সুস্থ থাকার তাগিদ থেকেও মানুষ এখন এ সহজপাচ্য সেদ্ধ খাবারের দিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি যারা ওজন কমাতে চান বা মেদহীন শরীরের খোঁজে ‘ক্যালরি ডেফিসিট’ ডায়েট করছেন, তাদের জন্য পাহাড়ি স্টাইলের এ সেদ্ধ সবজি দারুণ সমাধান হিসেবে কাজ করছে, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখলেও শরীরে কোনো বাড়তি ক্যালরি জমতে দেয় না।
সেদ্ধ সবজির পুষ্টি সমাচার
পাহাড়ি ঢঙে তৈরি এ খাবারের স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও অনেক। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, সবজি যখন অতিরিক্ত তেলে উচ্চ তাপে ভাজা হয় বা কষানো হয়, তখন এর ভেতরের ভিটামিন ‘সি’ এবং অন্যান্য দ্রবণীয় পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সামান্য পানিতে হালকা সেদ্ধ করার ফলে সবজির প্রাকৃতিক রঙ, স্বাদ, ভিটামিন এবং ফাইবার বা আঁশ পুরোপুরি বজায় থাকে, যা পরিপাকতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আবার এ খাবারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মরিচ বা শুঁটকি ভর্তায় সাধারণত কাঁচা বা পোড়া মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন এবং পুদিনা বা ধনেপাতা ব্যবহার করা হয়, যা প্রাকৃতিকভাবেই উচ্চ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ কার্যকর। যেহেতু পুরো খাদ্য প্রক্রিয়ায় কোনো স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা তেলের ব্যবহার নেই, তাই এটি রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য পরম নিরাপদ খাবার হিসেবে গণ্য হচ্ছে।