নেইল পলিশ না লাগানোই কি এখন ট্রেন্ড?

বিষয়টি যদিও এখন আর শুধু ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, নখের সাজসজ্জাকে ‘অরুচিকর’ আর একেবারে স্বাভাবিক নখকে ‘রুচিশীল’ হিসেবে দেখানোর মধ্য দিয়ে কি শ্রেণি ও সৌন্দর্যের পুরনো ধারণাই আবার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?

জীবনযাত্রার ব্যয়ও এমন পরিবর্তনের আরেকটি কারণ হতে পারে। কেউ সময় ও টাকা বাঁচাতে, কেউ ব্যায়ামের সময় নখ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে, আবার কেউ শুধুই আলসেমির কারণে নেইল পলিশের ব্যবহার ছেড়েছেন। এমনকি যারা বরাবরই নখে কিছু করতেন না, তারাও এখন নিজেদের পুরনো অভ্যাসকে এখন নতুন ফ্যাশনে পরিণত হতে দেখছেন।

নখ সাজাতে এতদিন যেখানে নানা রকম রঙ, পেইন্টিং আর কারুকাজের প্রতিযোগিতা ছিল, হালের সেই আগের আমেজে এখন যেন উল্টো হাওয়া বইছে। লন্ডনের উইম্যান স্পা-র মালিক পালোমা বুদেমায়ার সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক গ্রাহক দেখছেন, যারা নখ কাটছেন, ঘষে চকচকে করছেন, কিউটিকল পরিষ্কার ও ময়েশ্চারাইজ করছেন। কিন্তু শেষে কোনো নেইল পেইন্ট বা কালার পলিশিং করাচ্ছেন না। সোশ্যাল মিডিয়া, ফ্যাশন র‍্যাম্প ও তারকাদের উপস্থিতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই ‘বেয়ার নেইলস’ বা সাজসজ্জাহীন নখ এখন ‘নীরব আভিজাত্য’র নতুন প্রতীক হিসেবে আলোচিত।

বিষয়টি যদিও এখন আর শুধু ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, নখের সাজসজ্জাকে ‘অরুচিকর’ আর একেবারে স্বাভাবিক নখকে ‘রুচিশীল’ হিসেবে দেখানোর মধ্য দিয়ে কী শ্রেণী ও সৌন্দর্যের পুরনো ধারণাই আবার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?

সাংবাদিক ক্রিস্টিনা রোদুলফোর মতে, নেইল ডিজাইনিং বা এর ফ্যাশনের মূল শিকড় কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো ও এশীয় সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে এক সময়কার বৈচিত্র্যময় ফ্যাশন বা স্টাইলিং-কে পাশ কাটিয়ে সাদামাটা নখকে পশ বা উচ্চবিত্তের রুচির প্রতীক বানানো সংস্কৃতি ও পরিচয় মুছে দেয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। এই আলোচলা নেইল আর্টের ইতিহাসে বিস্তারিত থাকবে।

তবে সবার স্টাইলিং বা ফ্যাশন সেন্স তো আর এক নয়! তাই এ বিষয়গুলো ঘুরে-ফিরে পরিবর্তিত হতেই পারে।

যেমন আইরিশ টেলিভিশন উপস্থাপক অ্যাঞ্জেলা স্ক্যানলন বছরের পর বছর দুই সপ্তাহ পরপর সেলুনে গিয়ে ম্যানিকিউর করাতেন। নিউইয়র্কে থাকার সময় শুরু হওয়া এ অভ্যাস একপর্যায়ে তার কাছে চাপ মনে হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সময় ও ব্যস্ততা কমাতে তা ছেড়ে দেন তিনি। পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি নিজের এ সিদ্ধান্ত শেয়ার করার পর অনেকেই তাকে বাহবা দেন এবং তারাও একই পথে হাঁটার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয়ও এমন পরিবর্তনের আরেকটি কারণ হতে পারে। কেউ সময় ও টাকা বাঁচাতে, কেউ ব্যায়ামের সময় নখ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে, আবার কেউ শুধুই আলসেমির কারণে নেইল পলিশের ব্যবহার ছেড়েছেন। এমনকি যারা বরাবরই নখে কিছু করতেন না, তারাও এখন নিজেদের পুরনো অভ্যাসকে এখন নতুন ফ্যাশনে পরিণত হতে দেখছেন।

নেইল আর্টের ইতিহাস

অন্যদিকে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কৃত্রিম ও ঝলমলে নেইল আর্টের উদ্ভাবন ও প্রচারের পেছনে কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন ও এশীয় জনগোষ্ঠীর অবদান সবচেয়ে বেশি। অলিম্পিক জয়ী ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ-জয়নার থেকে শুরু করে পপ তারকা ডায়ানা রসের হাত ধরে নেল আর্ট তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির রূপ প্রকাশ করেছিল। সত্তর দশকে ভিয়েতনামি শরণার্থীদের মাধ্যমে নেইল বার চালু হওয়ার পর নেইল পলিশ সাধারণ মানুষের নাগালে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে রূপচর্চা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে যায়, উচ্চবিত্তরা তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নতুন প্রতীক তৈরি করে। সেই হিসাব থেকেই কৃত্রিম রং কিংবা বড় নখকে ‘অমার্জিত’ আখ্যা দিয়ে বেয়ার নেইলসকে বেশি আভিজাত্যপূর্ণ বলা হচ্ছে।

অবশ্য অনেকের কাছে এটি সামাজিক শ্রেণির বিষয় না হয়ে বরং সময় ও অর্থ বাঁচানোর সহজ পথ। একটানা নেল পলিশ লাগানো ও সাজ বজায় রাখার মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেক নারীই এখন এই ধারা বেছে নিচ্ছেন। কারণ অনেক সময় জটিল নেল আর্ট করানো কেবল ব্যয়বহুলই নয়, সময় ও মানসিক শক্তির বড় অপচয়। তাছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার দরুনও কৃত্রিম নখের অতিরিক্ত খরচ অনেকে এড়িয়ে চলছেন।

মজার বিষয় হলো, বাইরে থেকে ‘প্রাকৃতিক’ মনে হলেও এই বেয়ার নেইলস কিন্তু পুরোপুরি পরিচর্যাহীন নয়। নখকে পলিশ ছাড়াই মসৃণ ও চকচকে দেখাতে দীর্ঘ সময় বিউটি পার্লারে বসে প্রচুর টাকা খরচ করছেন অনেকেই। পার্লারগুলোতে এখন জেনডায়া বা জো ক্রাভিজের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের অনুকরণে কৃত্রিম উপায়েই স্বাভাবিক নখের অবয়ব তৈরি করা হচ্ছে।

নখ দিয়ে সামাজিক মর্যাদা মাপার লড়াই যদিও নতুন কিছু নয়। ত্রয়োদশ শতকে চীনে দীর্ঘ নখ রাখা ছিল কায়িক শ্রম থেকে মুক্ত থাকার প্রতীক। অর্থাৎ কারো বড় বড় নখ থাকাটাই প্রমাণ করত যে তিনি কোনো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ নন, বরং তিনি ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য।

পরে ১৮০০ সালের দিকে সমাজে একজন নারীর নখের পরিচর্যা তার নৈতিক চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের মাপকাঠি হিসেবে বিচার করা হতো। তখনকার সময়ে নখে সামান্য প্রাকৃতিক মোম বা তেল ঘষে স্বাভাবিক ও পরিষ্কার চকচকে ভাব বজায় রাখাকে স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাভাবিক সুস্থতার লক্ষণ মনে করা হতো। এতে সমাজ তাকে একজন রুচিশীল ও ভদ্র নারী হিসেবে গ্রহণ করত।

কিন্তু নখে অতিরিক্ত বা গাঢ় নেইল পলিশ ব্যবহার করাকে সমাজ ভালো চোখে দেখত না। সে আমলে অতিরিক্ত সাজগোজ বা কৃত্রিম রূপচর্চাকে অহংকার, প্রদর্শনেচ্ছা এবং অসৎ বা ‘হালকা’ চরিত্রের প্রতীক বলে মনে করা হতো। অর্থাৎ নেইল পলিশ ব্যবহার করাকে সমাজ নৈতিকভাবে ভালো বা সৎ নারী মনে করত না।

বিশ্লেষকদের মতে, একজন নারী তার নখে গাঢ় কালার পেইন্ট নাকি বেয়ার বা স্বাভাবিক রাখবেন, তা একান্তই তার ব্যক্তিগত পছন্দ হওয়া উচিত। এটিকে সামাজিক মর্যাদা কিংবা মার্জিত রুচির মাপকাঠি বানিয়ে ফেলা একেবারেই অনাবশ্যক।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা হয়তো নেইল পলিশ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো— সৌন্দর্যের কোন ধারণাকে আমরা ‘রুচিশীল’ বলছি, আর কে সেই রুচির সংজ্ঞা ঠিক করছে? অ্যাঞ্জেলা স্ক্যানলনের কথায়, কেউ নেইল পেইন্টিং ভালোবাসেন, আর কেউ বা ভালোবাসেন না। তাই পছন্দটুকু পছন্দ হিসেবেই থাকতে দেয়া উচিৎ। এ নিয়ে এত বিচার-বিশ্লেষণেরই বা প্রয়োজন কী?

—বিবিসি থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে

আরও