‘রিজেকশন সেনসেটিভ ডিসফোরিয়া’—প্রত্যাখ্যানের ভয় যখন অসহনীয়

রিজেকশন সেনসেটিভ ডিসফোরিয়া হলো কোনো অবহেলা, প্রত্যাখ্যান, সমালোচনা বা ঠাট্টাকে অত্যন্ত তীব্র ও মারাত্মক মানসিক যন্ত্রণার মাধ্যমে গ্রহণ করা। প্রত্যাখ্যান যে কারো জন্যেই কষ্টদায়ক হলেও আরএসডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুগুণ তীব্র হয়।

সামান্য কোনো ভুল, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর পরোক্ষ সমালোচনা কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় তোলা নির্দোষ কোনো রসিকতা—সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো ঘটনা। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে এ সামান্য বিষয়গুলো বুকে পাথর চেপে বসার মতো অভিজ্ঞতা তৈরি করে। মনে হয় শ্বাস আটকে আসছে, শরীরজুড়ে নেমে এসেছে তীব্র অপমান আর লজ্জা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ মানসিক অভিজ্ঞতাকে বলা হয় ‘রিজেকশন সেনসেটিভ ডিসফোরিয়া’ বা আরএসডি।

‘ডিসফোরিয়া’ একটি গ্রিক শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ ‘অসহনীয় যন্ত্রণা’। রিজেকশন সেনসেটিভ ডিসফোরিয়া হলো কোনো অবহেলা, প্রত্যাখ্যান, সমালোচনা বা ঠাট্টাকে অত্যন্ত তীব্র ও মারাত্মক মানসিক যন্ত্রণার মাধ্যমে গ্রহণ করা। প্রত্যাখ্যান যে কারো জন্যেই কষ্টদায়ক হলেও আরএসডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুগুণ তীব্র হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো কাল্পনিক বা সামান্য সমালোচনাকেও মূল্যায়নের বাইরে গিয়ে এক বিরাট ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে অনুভূত হয়।

এটি সাধারণত শারীরিক ও মানসিক—দুইভাবেই আত্মপ্রকাশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বুকে চাপ ধরা, শ্বাসকষ্ট, পেটে তীব্র অস্বস্তি কিংবা প্যানিক অ্যাটাক হতে দেখা যায়। বিষণ্নতা যেমন ধীরে ধীরে আসে, আরএসডির প্রতিক্রিয়া আসে মুহূর্তের মধ্যে। পাশাপাশি এতে আক্রান্তরা অন্যের নিরপেক্ষ মন্তব্য বা মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হওয়াকেও চরম অবহেলা বা শত্রুতা বলে ভুল ব্যাখ্যা করেন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আরএসডি একক কোনো রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয় না। এটি মূলত এডিএইচডি, অটিজম বা তীব্র অ্যাংজাইটিতে আক্রান্ত অর্থাৎ নিউরোডাইভারজেন্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ (অ্যামিগডালা) এবং যুক্তিনির্ভর অংশ (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স)-এর সংযোগে দুর্বলতা থাকলে এ ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অন্যদিকে শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও বড় ভূমিকা রাখে। নিউরোডাইভারজেন্ট শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সমাজ ও পরিবেশের কাছে প্রতিনিয়ত নানা সমালোচনার মুখোমুখি হয়, যা পরবর্তী জীবনে আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দিয়ে আরএসডির ভিত্তি তৈরি করে।

প্রত্যাখ্যানের এ অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অজান্তেই তিনটি আত্মরক্ষামূলক ঢাল বেছে নেন—পিপল-প্লিজিং, পারফেকশনিজম এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। কেউ সবাইকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন যাতে সমালোচনা না শুনতে হয়, কেউ ভুলের সুযোগ এড়াতে নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করতে চান, আবার কেউ প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকিমুক্ত থাকতে নতুন চাকরি বা সম্পর্কের সুযোগ থেকে পিছিয়ে আসেন।

যেহেতু আরএসডি মূলত আবেগের এক চরম ও অনিয়ন্ত্রিত রূপ, তাই এটি থেকে বেরিয়ে আসতে সঠিক সচেতনতা প্রয়োজন। প্রথমত, বুকের ভেতর চাপ, শ্বাসকষ্ট বা তীব্র লজ্জা অনুভূত হলে নিজেকে বোঝাতে হবে, এটি মস্তিষ্কের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। পরে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) ও গ্রাউন্ডিং টেকনিকের মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি কাছের বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে মন খুলে কথা বলা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এডিএইচডি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণও এ অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

আরএসডি কোনো অলীক অজুহাত বা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা নয়, এটি এক ধরনের স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। এটি সম্পর্কে জানার প্রথম ধাপই হলো নিজের প্রতি সহনশীল হওয়া। নিজেকে দোষ না দিয়ে সঠিক থেরাপি ও ভালোবাসার মাধ্যমে এ মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেদ করা সম্ভব।

সূত্র-দ্য গার্ডিয়ান

আরও