ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের গরম লাগে বেশি, কেন?

গবেষকদের মতে, পুরুষ ও নারীদের মধ্যে শারীরিক গঠন ও হরমোনের তারতম্যই এর প্রধান কারণ। জৈবিকভাবে নারীদের শরীর পুরুষদের তুলনায় ধীরগতিতে তাপ নিঃসরণ করে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। তীব্র গরমে নাজেহাল নারী-পুরুষ সবাই। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ পুরুষদের তুলনায় নারীদের ওপর বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) চিকিৎসকদের মতে, চরম তাপমাত্রা মূলত নারীদের কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালি তন্ত্রের ওপর একটি বড় ধরনের ‘স্ট্রেস-টেস্ট’ বা চাপ সৃষ্টি করে। ফলে নারীদের ক্ষেত্রে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও শারীরিক অবসাদ পুরুষের তুলনায় বেশি দেখা যায়।

গবেষকদের মতে, পুরুষ ও নারীদের মধ্যে শারীরিক গঠন ও হরমোনের তারতম্যই এর প্রধান কারণ। একাধিক চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, জৈবিকভাবে নারীদের শরীর পুরুষদের তুলনায় ধীরগতিতে তাপ নিঃসরণ করে। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে—

  • ঘামের উৎপাদন কম: পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরে ঘাম উৎপন্ন হয় কম এবং তা তুলনামূলক উচ্চ তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর নিঃসৃত হওয়া শুরু করে। ফলে নারীদের শরীর দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিতে পারে না।
  • শরীরের চর্বির হার: নারীর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই চর্বির বা ফ্যাটের অনুপাত পুরুষের চেয়ে বেশি থাকে। এ চর্বি শরীরের ভেতর তাপ ধরে রাখার জন্য একটি অন্তরক স্তর হিসেবে কাজ করে, যা অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

শরীরে তাপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে হরমোনের খেলাও রয়েছে। নারীর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মূলত ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ওপর নির্ভরশীল। ঋতুচক্রের দ্বিতীয় ভাগে প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নারীদের শরীরের মূল তাপমাত্রা এমনিতেই কিছুটা বেশি থাকে।

এরপর যখন ঋতুস্রাব শুরু হয়, তখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। এ হরমোনের ঘাটতি হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাছাড়া পিরিয়ডের সময় রক্তক্ষরণের কারণে শরীর আয়রন হারায়, যা রক্তে অক্সিজেন সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায়। এর ফলে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে নারীদের ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় করা এবং মাথা ঘোরার মতো লক্ষণগুলো বেশি দেখা দেয়।

পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোনের দ্রুত হ্রাসের কারণে ‘হট ফ্লাশ’ ও রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এ বয়সী নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গরমে সবচেয়ে বিপাকে পড়েন গর্ভবতী নারীরা। তাদের মেটাবলিক হিট বা বিপাকীয় তাপ উৎপাদন ও তরলের চাহিদা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। চলতি বছরে চিকিৎসাবিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ল্যানসেট-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থার প্রথম ও মধ্যবর্তী সময়ে প্রোজেস্টেরনের মাত্রার পরিবর্তন নারীদের বেশি গরম লাগার অনুভূতি তৈরি করে। শেষ দিকে শারীরিক গঠন বৃদ্ধির কারণে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ আরও বাড়ে। চিকিৎসকদের মতে, তীব্র তাপপ্রবাহ গর্ভাবস্থায় মা ও শিশু উভয়ের জন্যই উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের গবেষক ড. ক্যাট পিনহো-গোমেস জানান, কেবল জীববিজ্ঞানই নয়, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিও নারীদের তাপপ্রবাহজনিত ঝুঁকির পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। সমাজে নারীরাই সাধারণত যত্নশীল বা কেয়ারগিভারের ভূমিকা বেশি পালন করেন। ফলে চরম আবহাওয়ায় নিজের যত্ন নেয়ার সুযোগ তাদের কম থাকে। এছাড়া নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের চেয়ে বেশি হওয়ায় প্রবীণ বয়সে ডিমেনশিয়া বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের কারণে তারা তাপজনিত স্ট্রোকের শিকার হন বেশি।

আরও