সংসার স্বস্তিদায়ক রাখতে স্ত্রীর মানসিক ভারের ভাগ নিন

ঘরের সবকিছু সব সময় নিখুঁত রাখতে হবে—এমন চাপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। কোন কাজটি সত্যিই জরুরি আর কোনটি না করলেও চলে, সেটি নিয়ে দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিন। স্কুলের প্যারেন্টস হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের প্রতিটি নোটিফিকেশন দেখার চেয়ে কখনো কখনো সন্তানের সঙ্গে নিশ্চিন্তে কিছু সময় কাটানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে

‘আমার মাথার ভেতর সবসময় কোনো না কোনো তালিকা ঘুরতে থাকে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও মাথার ভেতর আগামীকালের টু-ডু তৈরি হতে থাকে।’ কথাগুলো বলছিলেন দুই সন্তানের এক মা। পেশায় তিনি গৃহিনী; কিন্তু একসময় করপোরেট খাতে নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। সংসারের প্রয়োজনে পেশাজীবনকে ত্যাগ করতে হয়েছে।

খালি চোখে সংসারের দৈনন্দিন কাজ বলতে আমরা বুঝি রান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা ঘর পরিষ্কার করা। কিন্তু এসব কাজের আড়ালে নারীদের প্রতিদিন আরো কিছু অদৃশ্য ও নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। কী করতে হবে তা মনে রাখা, আগেভাগে পরিকল্পনা করা, বিভিন্ন কাজের মধ্যে সমন্বয় করা এবং কোনো কিছু ভুলে না যাওয়ার জন্য সব সময় মাথা খাটানো—এসবও সংসার সামলানোরই অংশ। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় অদৃশ্য এ দায়িত্বকে বলা হয় ‘মেন্টাল লোড’ বা মানসিক ভার। গবেষণা বলছে, ঘরের কাজের পাশাপাশি এ মানসিক ভারের সিংহভাগই বহন করতে হয় নারীদের, বিশেষ করে মায়েদের।

যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার এক যৌথ গবেষণায় সম্প্রতি দেখা গেছে, সংসারের যেসব কাজে প্রতিনিয়ত চিন্তা করতে হয়—যেমন ফ্রিজের খাবার কখন নষ্ট হবে তা মনে রাখা, বিছানার চাদর ধোয়ার সময় নির্ধারণ কিংবা বাচ্চাদের পোশাকের মাপ ঠিক রাখা—তার ৭১ শতাংশের বেশি দায়িত্ব একাই সামলান মায়েরা। অন্যদিকে বাবারা তুলনামূলকভাবে এমন কাজ বেশি করেন, যেগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর বা প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হয়। যেমন গাড়ি সার্ভিসিং করানো কিংবা কোনো বিল পরিশোধ করা।

কেন এ মানসিক ভার নারীর কাঁধেই বেশি থাকে?

এর পেছনে বেশ কিছু সামাজিক ও পারিবারিক কারণ কাজ করে।

মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রভাব: সন্তানের জন্মের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই তুলনামূলক দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন। অন্যদিকে অনেক দেশে পিতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ থাকলেও তা তুলনামূলক কম সময়ের। ফলে সন্তানের জন্মের পর থেকেই মা হয়ে ওঠেন পরিবারের ‘ডিফল্ট প্যারেন্ট’—অর্থাৎ সন্তানের প্রয়োজন, সময়সূচি ও দৈনন্দিন বিষয়গুলোর প্রধান ব্যবস্থাপক। পরে মা কর্মক্ষেত্রে ফিরলেও পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় অভ্যাসবশত সবকিছুর জন্য তার ওপরই নির্ভর করতে থাকেন।

‘কী করতে হবে আমাকে বলো’ প্রবণতা: অনেক পুরুষ সংসারের কাজে অংশ নিতে চান। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার বদলে তারা প্রায়ই স্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন। অথচ কী রান্না হবে, ফ্রিজে কী আছে, কী কী বাজার করতে হবে—এসব ঠিক করাও একটি কাজ। ফলে কাজটি করার পাশাপাশি কীভাবে কাজটি করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের ভারও স্ত্রীর ওপর থেকে যায়।

সামাজিক সংস্কার: যুগ যুগ ধরে সংসার ও সন্তান সামলানোর দায়িত্বকে নারীর স্বাভাবিক কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে পুরুষরা সংসারের কাজে সহযোগিতা করলেও পরিবারের সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা, কী করা দরকার বা কী ভুলে যাওয়া হচ্ছে—এসবের মূল চিন্তার দায়িত্ব নারীর ওপরই থেকে যায়।

পরিবারের অদৃশ্য দায়িত্ব যখন অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন অনেক নারী কর্মজীবনেও এর প্রভাব অনুভব করেন। কেউ কাজের সময় কমিয়ে দেন, কেউ পার্ট-টাইম কাজ বেছে নেন, আবার কেউ চাকরি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতেও বাধ্য হন

ক্রমাগত মানসিক চাপের খেসারত

এ অবিরাম চিন্তা ও পরিকল্পনার চাপ ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করতে পারে। একসঙ্গে অনেক বিষয় মনে রাখা, সব সময় পরের কাজটি কী হবে তা ভাবতে থাকা এবং পরিবারের প্রয়োজনের প্রতি সারাক্ষণ সজাগ থাকার কারণে একজন মানুষ সহজেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। এতে ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

পরিবারের অদৃশ্য দায়িত্ব যখন অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন অনেক নারী কর্মজীবনেও এর প্রভাব অনুভব করেন। কেউ কাজের সময় কমিয়ে দেন, কেউ পার্ট-টাইম কাজ বেছে নেন, আবার কেউ চাকরি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতেও বাধ্য হন।

কীভাবে স্ত্রীর মানসিক ভার ভাগ করে নেবেন?

সংসার একটি যৌথ যাত্রা। তাই সঙ্গীর মানসিক চাপ কমানোর অর্থ শুধু ঘরের কাজে ‘সাহায্য করা’ নয়; বরং পরিবারের কিছু দায়িত্বের পুরোটা নিজের কাঁধে নেয়া।

এক. নির্দেশের অপেক্ষা না করে পূর্ণ দায়িত্ব নিন

রান্না করতে চাইলে কোথায় কী আছে তা স্ত্রীকে বারবার জিজ্ঞেস করবেন না। ফ্রিজ খুলে দেখুন কী আছে, কী প্রয়োজন তা ঠিক করুন এবং প্রয়োজন হলে বাজারও করুন। অর্থাৎ কোনো একটি কাজের শুধু একটি অংশ নয়, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো দায়িত্ব নিন।

যেমন, সন্তানদের স্কুলসংক্রান্ত বিষয়—পড়াশোনা, ফি দেয়া, খেলাধুলা বা প্রয়োজনীয় যোগাযোগের ভার একজন নিতে পারেন। অন্যজন নিতে পারেন বাজার কিংবা পরিবারের চিকিৎসাসংক্রান্ত দায়িত্ব।

দুই. অদৃশ্য কাজগুলো দৃশ্যমান করুন

সংসারে কে কী করছেন, তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন। স্ত্রী যে শুধু রান্না বা কাপড় ধোয়ার কাজই করছেন না, বরং পরিবারের নানা বিষয় মনে রাখছেন, পরিকল্পনা করছেন এবং সমন্বয় করছেন—সেটিও স্বীকার করুন। এই স্বীকৃতিই দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রথম ধাপ।

তিন. প্রযুক্তির সাহায্য নিন

জন্মদিন, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, স্কুলের অনুষ্ঠান কিংবা বিল দেয়ার তারিখ—সবকিছু একটি শেয়ার্ড ক্যালেন্ডার বা মোবাইল অ্যাপে রাখা যেতে পারে। এতে প্রতিটি বিষয় একজনকেই মনে রাখতে হবে না। প্রয়োজনীয় তথ্য ও দায়িত্বের হিসাব দুজনের কাছেই থাকবে।

চার. সবকিছু নিজের মতো করে করার সুযোগ দিন

আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর কাজটি হয়তো আপনার সঙ্গী যেভাবে করতেন, ঠিক সেভাবে হবে না। সেটি মেনে নেয়াও জরুরি। কাজের পদ্ধতি আলাদা হলেই তা ভুল নয়। দায়িত্ব ভাগাভাগির অর্থ হলো অন্যজনকে নিজের মতো করে কাজ করার সুযোগ দেয়া এবং প্রয়োজন হলে ভুল থেকে শেখার সুযোগ রাখা।

পাঁচ. অপ্রয়োজনীয় কাজ কমিয়ে আনুন

ঘরের সবকিছু সব সময় নিখুঁত রাখতে হবে—এমন চাপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। কোন কাজটি সত্যিই জরুরি আর কোনটি না করলেও চলে, সেটি নিয়ে দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিন। স্কুলের প্যারেন্টস হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের প্রতিটি নোটিফিকেশন দেখার চেয়ে কখনো কখনো সন্তানের সঙ্গে নিশ্চিন্তে কিছু সময় কাটানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সংসারের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করে নেয়া মানে শুধু কাজ কমানো নয়; এর মাধ্যমে সঙ্গীর সময়, শ্রম ও মানসিক চাপের প্রতি সম্মান দেখানো হয়। একজন যখন সবকিছু মনে রাখা, পরিকল্পনা করা ও সামলানোর দায়িত্ব থেকে কিছুটা মুক্তি পান, তখন দুজনের জন্যই সংসার স্বস্তি ও শান্তির জায়গায় পরিণত হয়।

আরও