২০১৬ সালে যখন রিও অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন এর গ্ল্যামার ধরে রাখার আড়ালে নিম্নবিত্ত আর বস্তিবাসী অসংখ্য মানুষকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেছিল ব্রাজিল সরকার। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া, কোটি কোটি দর্শকের চোখের সামনে একটা সফল অলিম্পিকের আয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু স্থানীয় জনগণ নিজের এতোদিনের ঠিকানা রাতারাতি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে যায়। ফরাসি সমাজতত্ত্ববিদ ও ফিল্মমেকার গাই ডেবোরের The Spectacle of Society বইয়ে ঠিক এ ধরনের ঘটনাকেই এনেছেন The Spectacle of Inequality এর আওতায়। চোখ-কান খুলে দেখলে বোঝা যাবে, আমাদের চারপাশেই হরদম এ ধরনের বৈষম্য হয়। আর এটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি হয় পাহাড়ে। সেটেলার ভাবাপন্ন আমরা মনে করি, পাহাড়ের মানুষ মানেই সরল (পড়ুন: বুদ্ধিহীন), আবেগপ্রবণ (পড়ুন: রগচটা), সাদাসিধে (পড়ুন: অল্পে খুশি) ও অনুগত (পড়ুন: সহজে বশ্য)—সমতলের বাঙালির এ ধারণাগুলো বরং শাসকের মতো, প্রতিবেশীর মতো নয়। পরিমল ভট্টাচার্যের লেখায় ঠিক এ কথাগুলোই কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে তাই সর্বৈব সত্য হয়ে উঠেছে।
হিল স্টেশনদের রানী দার্জিলিং। অথচ অফ সিজনের পুরোটা সময়জুড়ে কুয়াশার চাদরে যেন এক খেলনা শহরকে ফেলে রাখা হয় খেলা শেষে পড়ে থাকা পুতুলবাড়ির মতো। সেখানকার বাসিন্দাদের নিয়ে, তাদের অধিকার নিয়ে, চাওয়া-পাওয়া নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরই উদাসীন। শুধু যখনই পাহাড়ে বিপ্লবের আগুন লাগে, তখন তারা নড়চড়ে বসেন দমনের হোসপাইপে গ্যালন গ্যালন পানি ভরে ফায়ার সার্ভিস দেয়ার জন্য। পড়তে পড়তে নিজের দেশের কথাও মনে পড়ে যায় কোনো কোনো জায়গায়। পরিমল ভট্টাচার্য চিরচেনা দার্জিলিংয়ের ক্যাবারে নর্তকীর মতো উজ্জ্বল ঝলমলে পোশাকের আড়ালে থাকা দুঃখী, নির্মম পরিস্থিতির শিকার নারীটিকেই যেন ধরতে চেয়েছেন দরদের সঙ্গে। শীতল বাতাসের ঝাপ্টায় এক মন কেমন করা বিষণ্ণতা চেপে বসে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
চাকরি পেয়ে ইংরেজির লেকচারার হিসেবে পরিমল ভট্টাচার্য গিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ে। ছোটবেলায় দাদুর মুখে শোনা এ শৈলরানির গল্পকে ঠিক যেন মেলাতে পারেননি তার সামনে দাঁড়িয়ে। যেন সময়ের ব্যবধানে ক্রমশ পাল্টাতে থেকেছে একটা শহর আর সেই সময়কে দক্ষ রেকর্ডারের মতো পরিমল ছুঁতে চেয়েছেন ফুলস্কেপ কাগজে লিখে লিখে। একটা শহরের ঔপনিবেশিক অতীত, বহিরাগত চোখের রোমান্টিক সৌন্দর্যের আড়ালে নির্জন বিচ্ছিন্ন জীবনের কষ্ট, লড়াই আর আতঙ্কের গল্প আড্ডা জমিয়েছে ‘দার্জিলিং: স্মৃতি সমাজ ইতিহাস’ বইটির পাতায় পাতায়।
দার্জিলিংয়ের হোম ওয়েদারে মানুষ কেন আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে ওঠে সেই গল্প বলতে বলতে লেখক আমাদের চোখ মেলে দেখান স্থানীয় মানুষের জলকষ্ট, জীবন্ত ফসিল হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডার, পেমবার ছাতা, নিউটনের গিটারে ওয়েস্টার্ন পপ আর অতি অবশ্যই গোর্খাল্যান্ডের মরিয়া সময়ের দাবিতে মরিয়া দাওয়াইয়ের দৃশ্য। পরিমল এটাকে ‘পিছলে হারিয়ে যেতে থাকা সময়কে খামচে ধরার একটা চেষ্টা’ বলেন, আর সেই চেষ্টা সফল। একটা শহরের কুয়াশায় ভারী বাতাসে ভর করে থাকা রূহকে পরিমল লেখার আদলে জন্মাতে থাকা দৃশ্যের কোলাজে গেঁথে সঁপে দিয়েছেন পাঠকের কাছে। সেখানকার লেজ নাড়তে থাকা কালো কুচকুচে কুকুরগুলোর সাথে দোস্তি, লোকাল বার থেকে ফিরে বেনসন কুঞ্জুর সঙ্গে জোড়াথাঙের আলো খুঁজে ফেরা, হেমরাজ ছেত্রীর সাথে সিলভার ফারের জঙ্গলের আড়ালে পোখরির মাঝে স্যালাম্যান্ডারের মেটিং স্পটের সুলুক সন্ধান, জুলিয়ার সোনালি চুল আর বদলাতে থাকা চোখের মণির রংয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায় মন।
ভারতের বিখ্যাত সিরিজ ‘পাতাল লোক’ এর সেকেন্ড সিজনে ড্যানিয়েল নামের এক দুর্ধর্ষ স্নাইপারের চরিত্র করেছেন গোর্খা যুবক ‘প্রশান্ত তামাং’। এ প্রশান্ত তামাং কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল। ইন্ডিয়ান আইডলে গানের প্রতিযোগিতায় দার্জিলিং-সিকিমের হাজার হাজার মানুষ তাকে এসএমএস করে এনে দিয়েছিল বিজয়ীর সম্মান। ২০০৭ সালের পাহাড়ের এ কৌম অভ্যুত্থানের কথা তুলে আনতেও ভোলেননি পরিমল ভট্টাচার্য। বাদ পড়েনি দার্জিলিংজুড়ে এক সময় মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া এইডসের দৌরাত্ম্য। বেনসন কুঞ্জু কুঞ্জু নামের এক কেরালার যুবকের গল্পের মধ্য দিয়ে পরিমল এনেছেন সেই প্রসঙ্গ। যারা অঞ্জন দত্তের ২০১৯ সালের ‘ফাইনালি ভালোবাসা’ সিনেমাটা দেখেছেন, সেখানে অনির্বাণের এইডসে আক্রান্ত অভিনেতার চরিত্রটির কথা মনে করবেন। সেটাও কিন্তু দার্জিলিংয়ের তুলনামূলক কম আলো ফেলা এদিকটাকে নিয়ে এসেছিল। যদিও পরিমল ভট্টাচার্যের বেনসন কুঞ্জু কুঞ্জু, হেমরাজ ছেত্রী চরিত্রগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব সরাসরি নেই, বরং বাস্তবের খানিকটা ছায়া ধরে এসেছে।
পরিমল ভট্টাচার্যের লেখার ধাঁচ নিয়ে কথা বলতে গেলে ‘ঘোরলাগা’, ‘সম্মোহনী’ এ ধরনের বিশেষণ বলে দায়মোচন করা হয়তো যায়। কিন্তু নৈসর্গিক দৃশ্যকে পাঠকের মধ্যে চারিয়ে দেয়ার আশ্চর্য যে ক্ষমতা, সেটাকে এই সমস্ত শব্দে প্রকাশ করা কঠিন। দার্জিলিংয়ের কুয়াশা নিয়ে পড়তে পড়তে, পাঠকের মনও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আকাশে দেখা যায় মেঘের ওড়না। দার্জিলিং শহর একধরনের পাহাড়ি ছত্রাকের মতো গভীর আলস্য আর অবসাদের আবেশে ছড়িয়ে যায় মজ্জায় মজ্জায়। সেখানে রোদের রঙ সেপিয়া। প্রেতিনীর কান্নার মতো বাজে টয়ট্রেনের ইঞ্জিনের হুইসেল। ঘন শ্যাওলাবৃত বার্চের ডাল থেকে শিশির ঝরে টুপটাপ। পায়ের নিচে পিছলায় আলগা পাথর। আর কুয়াশায় দাঁড়কাক ডাকে—কুচকুচে কালো পালক আর ঠোঁটের ভেতরটা উজ্জ্বল গোলাপি। তার ডানার ঝাপটানিও দেখা যায় মনের চোখ দিয়ে। কোনো বারান্দায় ভারী হতে থাকা বুটের আওয়াজ আরও কাছে আসতে থাকে প্রতি সেকেন্ডের ব্যবধানে।