জীবনের যোগ-বিয়োগ

একসময় তিনিও তরুণ ছিলেন। ছিলেন ব্যস্ত। ছিল কাজ। সংসার ছিল। স্ত্রী ছিলেন। সন্তান ছিল। মাসের শেষে বেতন পাওয়ার হিসাব ছিল। বাজারের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা ছিল। ঈদের আগে নতুন জামা কেনার আনন্দ ছিল। অসুখ হলে হাসপাতালে ছোটাছুটি ছিল। বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল। তখন জীবনকে মনে হতো দীর্ঘ। এখন পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারেন, জীবন আসলে একই সঙ্গে দীর্ঘ এবং খুব ছোট

মানুষটির ঘরটা খুব বড় নয়। জানালার পাশে একটি পুরোনো চেয়ার। দেয়ালে কয়েকটি বিবর্ণ ছবি। আলমারির ওপর কাচের ফ্রেমে বাঁধানো বিয়ের দিনের ছবি, মানুষ দুজন এখন আর আগের মতো নেই। একজন নেই একেবারেই। অন্যজন আছেন, তবে বয়স তাকে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে অতীতই যেন সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে আপন।

সন্ধ্যা হলে তিনি কখনো বারান্দায় বসেন। রাস্তা দিয়ে মানুষ যায়। কেউ অফিস থেকে ফেরে, কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে বাড়ি ফেরে, কোনো কোনো শিশু দৌড়ে যায়। তিনি তাকিয়ে থাকেন। এ মানুষগুলোর কেউ তাকে চেনে না। অথচ তাদের এ ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্যেই তিনি নিজের বহু বছরের জীবন দেখতে পান।

একসময় তিনিও তরুণ ছিলেন। ছিলেন ব্যস্ত। ছিল কাজ। সংসার ছিল। স্ত্রী ছিলেন। সন্তান ছিল। মাসের শেষে বেতন পাওয়ার হিসাব ছিল। বাজারের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা ছিল। ঈদের আগে নতুন জামা কেনার আনন্দ ছিল। অসুখ হলে হাসপাতালে ছোটাছুটি ছিল। বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল। তখন জীবনকে মনে হতো দীর্ঘ। এখন পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারেন, জীবন আসলে একই সঙ্গে দীর্ঘ এবং খুব ছোট।

একটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার সম্ভবত এটাই। যে সময়টাকে বেঁচে থাকার সময় মনে হয়, একদিন সেটিই স্মৃতি হয়ে যায়।

দেশে আমরা বয়স বাড়াকে প্রায়ই এক ধরনের অপ্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখতে শুরু করি। কর্মজীবন শেষ মানে যেন মানুষের প্রয়োজনও শেষ। সন্তান বড় হয়ে নিজের সংসারে চলে গেলে বাবা-মায়ের ভূমিকা যেন ধীরে ধীরে কমে আসে। শরীর দুর্বল হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও অনেক সময় কমে যায়। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে তাকে ‘সেকেলে’ বলা হয়। নতুন প্রজন্মের কথোপকথনে জায়গা না পেলে তিনি ক্রমে নিজের ঘরেই অতিথি হয়ে ওঠেন।

কিন্তু একজন বৃদ্ধ মানুষের শরীর হয়তো ধীর হয়ে গেছে, তার জীবন থেমে যায়নি। বরং বয়সের সঙ্গে এমন কিছু জিনিস তার কাছে স্পষ্ট হয়, যা তরুণ বয়সে দেখা সম্ভব ছিল না।

যে মানুষটি সারাজীবন অর্থ উপার্জন করেছেন, তিনি একসময় বুঝতে পারেন; ব্যাংক হিসাবে জমে থাকা টাকা নয়, সন্তানের সঙ্গে কাটানো একটি বিকেলই হয়তো বেশি মূল্যবান ছিল। যে মা সারাজীবন সংসারের জন্য রান্না করেছেন, তিনি হয়তো শেষ বয়সে বুঝতে পারেন; সন্তানদের জন্য রান্না করা খাবারের চেয়ে তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া সময়টিই ছিল আসল সম্পদ। যে বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে সারাজীবন কাজ করেছেন, তিনি একদিন বুঝতে পারেন; সন্তানের পরীক্ষার ফল, চাকরি কিংবা আয় নয়; ছোটবেলায় তার হাত ধরে হাঁটার স্মৃতিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।

জীবনের হিসাব বয়স বাড়ার সঙ্গে বদলে যায়। তরুণ বয়সে আমরা ভবিষ্যৎ জমাই। বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতি গুছাই। প্রতিটি পরিবারেই এ স্মৃতির ভাণ্ডার ছড়িয়ে আছে। পুরোনো ট্রাংকে রাখা চিঠি। বিয়ের ছবি। সন্তানের প্রথম স্কুলব্যাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কাগজ। পুরোনো ঘড়ি। বিদেশ থেকে পাঠানো কার্ড। ঈদের পাঞ্জাবি। বাবার হাতে লেখা কোনো হিসাবের খাতা। মায়ের রান্নাঘরের পুরোনো বাটি।

এসবের আর্থিক মূল্য প্রায় নেই। কিন্তু মানুষের জীবনে সবকিছুর মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না। একজন বৃদ্ধ মানুষ হয়তো নিজের পুরোনো ঘরে বসে এমন একটি মুখের কথা ভাবছেন, যাকে আর কোনোদিন দেখা হবে না। হয়তো স্ত্রী নেই। হয়তো সন্তান বিদেশে। হয়তো সন্তান পাশের শহরেই থাকে, কিন্তু মাসে একবার দেখা করতে আসে। হয়তো বন্ধুরা একে একে চলে গেছেন। ফোনবুকের অনেক নম্বর এখন আর কেউ ধরে না। তারপরও জীবন থেকে সব আনন্দ মুছে যায় না।

সকালের রোদে বারান্দায় বসা যায়। নাতির সঙ্গে কথা বলা যায়। পুরোনো গান শোনা যায়। পাশের বাড়ির গাছটিতে নতুন পাতা এসেছে, সেটা দেখা যায়। বৃষ্টির শব্দ শোনা যায়। বহু বছর আগে পড়া একটি বই আবার পড়া যায়। পুরোনো ছবি বের করে মানুষের মুখ চেনা যায়।

জীবন কখনো কখনো খুব ছোট ছোট জায়গায় ফিরে আসে। আমাদের সমাজে প্রবীণ মানুষদের নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো তাদের আমরা ভবিষ্যৎহীন মানুষ হিসেবে দেখি। যেন ভবিষ্যৎ কেবল তরুণদের জন্য। বয়স্ক মানুষের সামনে কেবল অতীত।

কিন্তু ভবিষ্যৎ মানে শুধু নতুন চাকরি, নতুন বাড়ি, নতুন ব্যবসা কিংবা নতুন সম্পর্ক নয়। আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে ওঠারও একটি ভবিষ্যৎ আছে। আগামী বিকেলে নাতির সঙ্গে বসারও তো একটি ভবিষ্যৎ আছে। বহুদিন পর কোনো পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলারও একটি ভবিষ্যৎ আছে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কাছেও আগামীকাল একটি পূর্ণাঙ্গ দিন।

এ উপলব্ধিটি আমাদের পরিবার ও সমাজে খুব জরুরি। কারণ আমরা প্রায়ই বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে কথা বলি দায়িত্বের ভাষায়—খরচ কে দেবে, চিকিৎসা কে করাবে, কে দেখবে, কোথায় থাকবে? কিন্তু একজন মানুষকে শুধু তার প্রয়োজনের তালিকা দিয়ে দেখা যায় না। তারও স্মৃতি আছে, অভিমান আছে, পছন্দ আছে, অপছন্দ আছে, গল্প আছে, অসমাপ্ত কথা আছে। সবচেয়ে বড় কথা, তার নিজের জীবন সম্পর্কে নিজের একটি বোধ আছে।

যে বাবা আমাদের শৈশবের প্রতিটি ছোট প্রয়োজন পূরণ করেছেন, তার নিজের ছোট প্রয়োজনটিও হয়তো খুব বেশি নয়। তিনি হয়তো শুধু চান, কেউ কিছুক্ষণ পাশে বসুক। যে মা সারাজীবন সন্তানের পছন্দের রান্না করেছেন, তিনি হয়তো এখন চান কেউ তাকে জিজ্ঞেস করুক—আজ কী খেতে ইচ্ছে করছে?

এ প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু মানুষের শেষ বয়সে সাধারণ জিনিসের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সম্ভবত বুঝতে শেখে, জীবনের সব ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কেউ অসুস্থ হয়। কেউ মারা যায়। কোনো সম্পর্ক ভেঙে যায়। সন্তান দূরে চলে যায়। চাকরি হারাতে হয়। কোনো স্বপ্ন পূরণ হয় না।

এসবের অনেক কিছুই আমাদের ইচ্ছার বাইরে। তবুও একটি বিষয় মানুষের হাতে থাকে—সে তার জীবনের দিকে কীভাবে তাকাবে। একজন মানুষ তার হারানো মানুষদের কথা মনে করে সারাজীবন কাঁদতে পারেন। আবার তাদের সঙ্গে কাটানো সময়ের জন্য কৃতজ্ঞও হতে পারেন।

দুটিই সত্য। শোকের সঙ্গে কৃতজ্ঞতার কোনো বিরোধ নেই। প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট থাকবে। কিন্তু সেই মানুষটি জীবনে ছিলেন, এটিও একটি সৌভাগ্য। কোনো সন্তানের সঙ্গে ৩০ বছর কাটানোর পর সেই সন্তানকে হারানোর বেদনা থাকবে। কিন্তু সে ৩০ বছর তো ছিল। কোনো স্ত্রীর সঙ্গে ৪০ বছরের সংসার শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই ৪০ বছর তো আর মুছে যায় না।

মানুষ চলে যায়। সময় চলে যায়। স্মৃতি থেকে যায়। এ কারণেই প্রবীণের গল্প আসলে শুধু বৃদ্ধ মানুষের গল্প নয়। এটি আমাদের সবার ভবিষ্যতের গল্প। আজ যে তরুণ বাবা সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন, একদিন তিনিও হয়তো সেই সন্তানের অপেক্ষায় বারান্দায় বসবেন। আজ যে মা সন্তানের পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন, একদিন হয়তো সেই সন্তানই তার ওষুধের সময় মনে করিয়ে দেবে। আজ যে মানুষটি ব্যস্ত শহরে নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করছেন, একদিন তারও হয়তো ব্যস্ততার ভেতর থেকে একটি পুরোনো দিনের কথা মনে পড়বে।

তখন হয়তো তিনি বুঝবেন—জীবন শুধু অর্জনের যোগফল নয়। জীবন হলো মানুষদের সঙ্গে কাটানো সময়েরও একটি হিসাব। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা মানুষটি হয়তো পরের দিনের অপেক্ষায় বসে থাকেন। কারণ বয়স যতই হোক, মানুষের গল্প শেষ হয় না—যতক্ষণ তার মনে আগামীকালের জন্য সামান্য হলেও কোনো অপেক্ষা বেঁচে থাকে।

আরও