সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নাশতা করতে করতে কানে ইয়ারফোন, রাস্তায় বের হয়েও সেটি খুলছেন না। বাসে বা রিকশায় বসে যানজটের মধ্যে আটকে আছেন, চারপাশে গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল। এমন পরিস্থিতিতে পছন্দের গান কিংবা পডকাস্ট শুনতে শুনতে সময় কাটানোই স্বস্তির মনে হতে পারে।
শুধু যাতায়াতের পথেই নয়, বাসায় ফিরে ঘরের কাজ করার সময়ও অনেকের কানে থাকে ইয়ারফোন বা এয়ারবাডস। কেউ রান্না করতে করতে গান শোনেন, কেউ বাসন ধোয়া কিংবা ঘর গোছানোর সময় পছন্দের পডকাস্ট চালিয়ে রাখেন। এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত কানে কিছু একটা শোনার অভ্যাসও রয়েছে অনেকের।
ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে চারপাশের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে থাকতে কিংবা প্রতিদিনের একঘেয়েমি কাটাতে এমন অভ্যাস বেশ স্বাভাবিক মনে হতে পারে। মানুষের ভিড়ে থেকেও নিজের মতো একটা জগৎ তৈরি করে নেয়ার সুযোগ দেয় হেডফোন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সব সময় কানে কিছু একটা শুনতে থাকার অভ্যাস আমাদের অজান্তেই চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে কিনা?
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহারের প্রভাব শুধু শ্রবণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি নীরবে নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাসেও প্রভাব ফেলতে পারে।
হেডফোন কি অন্যদের থেকে দূরে রাখছে
অনেকের কাছে হেডফোন ব্যবহার এখন আর সচেতন কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রতিদিনের অভ্যাস। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনের ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. গ্লোরিয়া মার্কের মতে, মানুষ অনেক সময় অজান্তেই অন্যদের থেকে নিজেকে আড়াল করতে হেডফোন ব্যবহার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সেন্টার ফর হেলদি মাইন্ডসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রিচার্ড ডেভিডসনের পর্যবেক্ষণেও বিষয়টি উঠে এসেছে। তার মতে, হেডফোন ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের অনেক সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ হারাচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাডিসন ক্যাম্পাসে চলাফেরা করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশের কানে হেডফোন দেখা যায়। অথচ ১০ বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভিন্ন পরিবেশ ও পটভূমি থেকে আসা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, কথা বলা এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা। কিন্তু সবাই যদি কানে হেডফোন দিয়ে চলাফেরা করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ কমে যায়।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কফিশপ বা অন্য কোনো জায়গায় অপেক্ষা করার সময়ও অনেকের হাতে থাকে স্মার্টফোন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত মানুষটির সঙ্গে একটু হাসিমুখে কথা বলা কিংবা সাধারণ কুশল বিনিময়ের সুযোগও আর তৈরি হয় না।
ছোট ছোট যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ
অপরিচিত মানুষের সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য হলেও কথা বলা বা হাসিমুখে যোগাযোগ করা আমাদের ভালো থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কিন্তু কানে হেডফোন থাকলে এসব সুযোগ সহজেই হাতছাড়া হয়। আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কারো সঙ্গে চোখাচোখি হলে একটু হাসা কিংবা নতুন কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো স্বাভাবিক ঘটনাগুলোও এড়িয়ে যাই আমরা।
ব্যস্ত শহরগুলোয় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। বাসে, রাস্তায়, লিফটে কিংবা কর্মস্থলে। কিন্তু একই জায়গায় অনেক মানুষের উপস্থিতি থাকলেই যে সামাজিক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে, তা নয়। কানে ইয়ারফোন দিয়ে নিজের পছন্দের গান শুনতে শুনতে হয়তো আমরা পাশাপাশি বসে থাকা মানুষটির সঙ্গেও কথা বলার সুযোগ হারাচ্ছি।
নীরবতারও প্রয়োজন আছে
হেডফোনের আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাসে। সব সময় গান, পডকাস্ট কিংবা অন্য কোনো শব্দ শুনতে থাকলে নীরবে বসে থাকা বা নিজের চিন্তাভাবনাকে সময় দেয়ার সুযোগ কমে যায়।
গ্লোরিয়া মার্কের মতে, মানুষ এখন নীরবে বসে থাকা, নিজের চিন্তায় ডুবে থাকা কিংবা একঘেয়েমিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছে। কারণ, বিরক্তি বা একঘেয়েমি অনুভব হলেই হাতের কাছে থাকা ফোন কিংবা হেডফোন দিয়ে তা দূর করার সুযোগ রয়েছে।
অথচ নীরব সময়টুকুও আমাদের জন্য উপকারী হতে পারে। কোনো কিছু না শুনে হাঁটতে গেলে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়। নিজের চিন্তাভাবনা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বর্তমানে যা করছেন, তাতে মনোযোগ দেয়াও সহজ হতে পারে।
হেডফোন ছাড়া কিছুক্ষণ থাকার পরীক্ষা
নিউইয়র্কের ২৪ বছর বয়সী আতিরা গালির দৈনন্দিন জীবনেও হেডফোনের ব্যবহার ছিল প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই তার স্পটিফাই অ্যাকাউন্টের বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, তিনি ৩৩ হাজার ৫০০ মিনিট গান শুনেছিলেন।
সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথ থেকে শুরু করে অফিসের কাজ, বাসায় ফেরার যাত্রা, রাতের ঘরের কাজ—প্রায় সব সময়ই তার কানে থাকত হেডফোন। এমনকি বাসন ধোয়ার মতো সাধারণ কাজ করতেও গান না শুনলে তার একঘেয়ে লাগত।
তবে নিজের এই অভ্যাস নিয়ে একসময় ভাবতে শুরু করেন গালি। তার মনে প্রশ্ন জাগে, গান শুনতে শুনতে সব কাজ করার অভ্যাস কি তাকে গান ছাড়া স্বাভাবিক কাজগুলো উপভোগ করতে বাধা দিচ্ছে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গান না শোনার সিদ্ধান্ত নেন। দেখতে চেয়েছিলেন, এতে চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে আরো সচেতন হওয়া যায় কিনা।
পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই দিনেই তিনি নিজের এলাকায় নতুন চারটি দোকানের সাইনবোর্ড দেখতে পান। অথচ প্রতিদিন একই পথ দিয়ে যাতায়াত করলেও আগে সেগুলো তার চোখে পড়েনি।
গালির ভাষায়, হেডফোন কানে থাকলে তিনি সাধারণত মাথা নিচু করে হাঁটেন। ফলে আশপাশে কী ঘটছে, সেদিকে তেমন খেয়াল থাকে না।
তার এই ছোট্ট অভিজ্ঞতা আমাদেরও ভাবতে শেখায়। প্রতিদিনের পরিচিত পথে চলতে গিয়ে হয়তো কত কিছুই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ, রাস্তার নতুন কোনো দোকান কিংবা চারপাশের ছোট ছোট পরিবর্তন—এসবের দিকে খেয়াল করার সুযোগও কমে আসে।
হেডফোন ব্যবহার অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। ঢাকার মতো কোলাহলপূর্ণ শহরে এটি অনেকের জন্য যাতায়াতের একঘেয়েমি কাটানোর উপায়ও হতে পারে। তবে সব সময় কানে কিছু একটা বাজতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিরাপদ পরিবেশে কখনো কখনো ইয়ারফোন খুলে চারপাশের শব্দ শোনা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও প্রয়োজন।
হয়তো প্রতিদিনের ব্যস্ত যাত্রাপথে কিছুটা সময় নিজের চারপাশের দিকে মনোযোগ দিলেই চোখে পড়বে এমন অনেক কিছু, যা এত দিন আমাদের অগোচরেই ছিল।
সিএনএন অবলম্বনে