অটিজমকে একসময় বিরল স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অটিজম শনাক্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—অটিজম কি সত্যিই বাড়ছে, নাকি আগের তুলনায় শুধু বেশি শনাক্ত হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজমের প্রকৃত হার বেড়েছে—এমন প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। বরং উন্নত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অটিজমের সংজ্ঞা বিস্তৃত হওয়াই এ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে দেশটিতে প্রতি ১৫০ জন আট বছর বয়সী শিশুর মধ্যে একজনের অটিজম শনাক্ত হতো। ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ৩১ জনে একজন। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে অন্তত একজন অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছে। তবে সংস্থাটি বলছে, অনেক দেশে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শনাক্তের হার বাড়ার অন্যতম কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে অটিজমের সংজ্ঞার পরিবর্তন। ১৯৪৩ সালে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও কানার প্রথম ‘ইনফ্যান্টাইল অটিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরে ধাপে ধাপে রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল (ডিএসএম)-এ প্রথম অটিজম অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৮০ সালে। আর এরপর ১৯৯৪ সালে অ্যাসপারগার সিনড্রোমকে অটিজমের আওতায় আনা হয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০১৩ সালে। তখন ডিএসএম-৫ সংস্করণে অটিজম, অ্যাসপারগার সিনড্রোম এবং অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যাকে একত্র করে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) নামে একটি একক শ্রেণিতে আনা হয়। পরবর্তী সংস্করণে একই ব্যক্তির অটিজম ও এডিএইচডি একসঙ্গে নির্ণয়ের সুযোগও যুক্ত হয়। আগে এ দুটি রোগ একসঙ্গে শনাক্ত করার সুযোগ ছিল না।
অটিজম এখন শুধু শিশুদের রোগ হিসেবে দেখা হয় না। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও অটিজম শনাক্তের হার দ্রুত বাড়ছে। গবেষকদের মতে, এর বড় কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। অনেকেই জীবনের অনেক পরে নিজের আচরণ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে অটিজমের মিল খুঁজে পেয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
২০০৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের ১৮ ও ২৪ মাস বয়সে নিয়মিত অটিজম স্ক্রিনিংয়ের সুপারিশ করা হচ্ছে। বর্তমানে ৯, ১৮ ও ৩০ মাস বয়সেও বিকাশজনিত মূল্যায়নের পরামর্শ দেয়া হয়। ফলে আগে যেসব শিশু শনাক্ত হতো না, এখন তাদেরও তুলনামূলক কম বয়সেই অটিজম ধরা পড়ছে।
সিডিসির তথ্যানুযায়ী, ছেলেদের অটিজম নির্ণয়ের হার মেয়েদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, মেয়েদের মধ্যে অটিজম কম নয়; বরং তা শনাক্ত করা কঠিন। কারণ অনেক মেয়ে সামাজিক আচরণ অনুকরণ করে নিজের সমস্যাগুলো আড়াল করতে পারে। এছাড়া মেয়েদের মধ্যে অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য ছেলেদের মতো স্পষ্ট না হওয়ায় অনেক সময় তাদের স্ক্রিনিংই করা হয় না।
এছাড়া অটিজম নির্ণয়ের জন্য এখনো কোনো রক্ত পরীক্ষা বা মস্তিষ্কের স্ক্যান নেই। চিকিৎসকরা মূলত ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ, ভাষা এবং পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেই অটিজম নির্ণয় করেন। এ কারণে একই স্পেকট্রামের ভেতরেও একজনের লক্ষণ অন্যজনের চেয়ে অনেক ভিন্ন হতে পারে।
একসময় অটিজম নিয়ে সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা ছিল বেশি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণার কারণে অটিজম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা বেড়েছে। অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, যা অন্যদেরও সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজম শনাক্ত হওয়া মানেই শুধু একটি রোগের নাম জানা নয়; এটি প্রয়োজনীয় সহায়তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক সমর্থনের পথও খুলে দেয়। তাই নিজের বা পরিবারের কারো মধ্যে অটিজমের লক্ষণ দেখা গেলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সিম্পলি সাইকোলজি ও নিউজউইক থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে