ওভার দা কাউন্টার (ওটিসি) পেইনকিলার হিসেবে গোটা বিশ্বেই আইবুপ্রোফেন এবং এসিটামিনোফেনের (প্যারাসিটামল) ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। তবে এ আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামলই এখন বিশ্বব্যাপী অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা রোগজীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বড় কারণ হয়ে উঠছে বলে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামল আলাদাভাবে ব্যবহার হলেও সেটি এ সংকটকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। আর একসঙ্গে ব্যবহার হলে তা এ বৃদ্ধির মাত্রা দাঁড়ায় আরো কয়েকগুণ।
অন্ত্র ও মূত্রনালীর সংক্রমণ ঘটানো ব্যাকটেরিয়া ইশেরিশিয়া কোলাইয়ের (ই. কোলাই) ওপর বহুমাত্রিক অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রোফ্লক্সাসিনের সঙ্গে নানা ধরনের পেইনকিলার ও প্রদাহনাশক একযোগে প্রয়োগ কী ধরণের প্রভাব ফেলে সেটিকে পর্যালোচনা করে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামল ব্যাকটেরিয়াটির জিনে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটায়। এর মধ্য দিয়ে ব্যাপক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে ই. কোলাই।
গবেষণার ফলাফল নেচার ম্যাগাজিনের নেচার পার্টনার জার্নালে (এনপিজে) ‘দ্য ইফেক্ট অব কমনলি ইউজড নন-অ্যান্টিবায়োটিক মেডিকেশনস অন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপমেন্ট ইন ইশেরিশিয়া কোলাই’ শিরোনামে প্রকাশ হয়েছে।
এএমআর বা জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ক্ষমতা বেড়ে যাওয়াকে এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির হিসাবে এএমআরের কারণে শুধু ২০১৯ সালেই বিশ্বে প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সহযোগী অধ্যাপক রিয়েটি ভেন্টারের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণজনিত রোগ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক বহুদিন ধরে অপরিহার্য। কিন্তু এর অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত ও অপব্যবহারের কারণে বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ছে। আমরা ত্বক, অন্ত্র বা মূত্রনালীর সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রোফ্লক্সাসিনের সঙ্গে সাধারণ চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক নয় এমন ওষুধের যৌথ প্রভাব কেমন হয় তা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছি। আমরা দেখেছি, যখন এ ব্যাকটেরিয়া সিপ্রোফ্লক্সাসিনের পাশাপাশি আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামলের সংস্পর্শে আসে, তখন এর জিনগত গঠনে একক কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি প্রভাব পড়ে। এতে এ ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সক্ষমতা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে এগুলোর বৃদ্ধিও হয় অত্যন্ত দ্রুত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এর মধ্য দিয়ে এসব ব্যাকটেরিয়া শুধু সিপ্রোফ্লক্সাসিন নয়, বরং বিভিন্ন শ্রেণির আরো একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সক্ষমতাও গড়ে তোলে।’
রিয়েটি ভেন্টার বলেন, ‘আমরা এ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনের জিনগত প্রক্রিয়াও উন্মোচন করেছি। দেখা গেছে, আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামল—উভয়ই ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে অ্যান্টিবায়োটিককে তারা শরীর থেকে বের করে দেয় এবং এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।’
গবেষণায় কয়েকটি প্রবীণ সেবাকেন্দ্রের বাসিন্দাদের ওপর ব্যাপকমাত্রায় ব্যবহৃত নয়টি ওষুধের প্রভাবকে পর্যালোচনা করা হয়। এগুলো হলো আইবুপ্রোফেন (প্রদাহরোধী ও ব্যথানাশক), ডাইক্লোফেনাক (আর্থ্রাইটিসের প্রদাহরোধক), এসিটামিনোফেন (ব্যথা ও জ্বর কমানোর প্যারাসিটামল), ফিউরোসেমাইড (উচ্চ রক্তচাপের জন্য), মেটফরমিন (ডায়াবেটিসজনিত রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধ), অ্যাটোরভাস্টাটিন (রক্তে কোলেস্টেরল ও চর্বি কমাতে), ট্রামাডল (শল্যচিকিৎসার পর শক্তিশালী ব্যথানাশক), টেমাজেপাম (ঘুমের সমস্যা চিকিৎসায়) ও সুডোএফেড্রিন (নাক বন্ধের সমস্যা কমাতে)।
রিয়েটি ভেন্টার বলেন, এ গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়টি এখন আগের ধারণার চেয়ে অনেক জটিল। কারণ এখন দেখা যাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক-বহির্ভূত সাধারণ ওষুধও এখানে ভূমিকা রাখছে। এ গবেষণার ফলাফল থেকে আমরা যে সতর্কবাণীটি পাচ্ছি সেটি হলো একসঙ্গে একাধিক ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি খুব ভালোভাবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে প্রবীণ সেবাকেন্দ্রে। কারণ সেখানে বয়স্ক রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় নানা ধরনের ওষুধ খাওয়ানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে এসব ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বরং এগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে কেমন প্রতিক্রিয়া করে, সে বিষয়ে আরো ভালোভাবে খেয়াল রাখা দরকার।’
গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধের পারস্পরিক প্রভাব নিয়ে আরো গবেষণা করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণত ব্যবহৃত ওষুধগুলো কিভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে তা আরো ভালোভাবে বোঝা যায়।