প্যাচওয়ার্ক— শান্তিনিকেতনের প্রভাব বনাম বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য

ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা প্যাচওয়ার্ক যেখানে জ্যামিতিক নকশায় বিভিন্ন কাপড় জোড়া দিয়ে অলংকারমূলক টেক্সটাইল তৈরি করা হয়, তার বিকাশ ইউরোপ ও আমেরিকায় একটি স্বতন্ত্র ধারায় হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলার কাঁথা বিকশিত হয়েছে স্থানীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায়। এর মূল ভিত্তি ছিল পুরোনো কাপড়ের পুনর্ব্যবহার, স্তরবিন্যাস এবং হাতে সেলাই

প্যাচওয়ার্ক আজকের সময়ে ভীষণ জনপ্রিয় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ছেঁড়া কাপড় জোড়া দিয়ে তৈরি এ পোশাকগুলোকে কেউ বলছে নিছক জেনজিদের ট্রেন্ড, আবার কেউ বলে ভারতের ‘শান্তিনিকেতন’ থেকে এ ট্রেন্ড বাংলাদেশে এসেছে। আসলে এ ফ্যাশনের জন্ম কোথায় কীভাবে হয়েছিল, তার ইতিহাস দীর্ঘ।

আজ যে রঙিন প্যাচওয়ার্ক কাঁথা, ব্যাগ কিংবা কুশন দেখে আমরা মুগ্ধ হই, তার জন্ম কিন্তু সৌন্দর্যের জন্য হয়নি। এর শুরু হয়েছিল অভাব থেকে। শীত থেকে বাঁচার জন্য। কাপড়ের মূল্য এত বেশি ছিল যে একটি ছেঁড়া জামার টুকরোও ফেলে দেয়ার মতো সুযোগ (বিলাসিতা) মানুষের ছিল না। আর সেই প্রয়োজনই হাজার হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে এক অসাধারণ শিল্পরীতিতে।

যখন কাপড় ছিল সম্পদ

আজকের পৃথিবীতে কাপড় উৎপাদন একটি শিল্প। কিন্তু হাজার বছর আগে একটি পোশাক তৈরি করতে সপ্তাহ, কখনো মাস লেগে যেত। সুতা কাটা, তাঁত বোনা, রং করা সবই ছিল হাতে। ফলে কাপড় ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। একটি পোশাক পুরোনো হলে সেটি ছোটদের জন্য নতুন করে সেলাই করা হতো। আরো পুরোনো হলে তা কেটে অন্য পোশাক বানানো হতো। শেষে তার টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে তৈরি হতো কম্বল, বিছানার আবরণ কিংবা মোটা কাপড়। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, প্যাচওয়ার্কের জন্ম কোনো শিল্পচর্চা হিসেবে নয়, বরং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার এক বুদ্ধিদীপ্ত উপায় হিসেবে। পরে মানুষ বুঝতে শুরু করে, এই জোড়া দেয়া কাপড়ও নান্দনিক হতে পারে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শিল্পের সূচনা।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো প্যাচওয়ার্ক- আসলে কত পুরোনো?

প্যাচওয়ার্কের সঠিক আবিষ্কারের সময় বা স্থান সঠিকভাবে জানা যায় না। কারণ কাপড় খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের অধিকাংশ বস্ত্রই টিকে নেই। তবু প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার আমাদের কিছু ধারণা দেয়। মিসরের বিভিন্ন সমাধিক্ষেত্রে পাওয়া কয়েক হাজার বছর পুরোনো লিনেন কাপড়ে মেরামত ও জোড়া লাগানোর নিদর্শন পাওয়া গেছে। এগুলো আধুনিক অর্থে অলংকারমূলক প্যাচওয়ার্ক না হলেও, কাপড়ের টুকরো জুড়ে পুনর্ব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের প্রাচীন বস্ত্র মেরামতের নিদর্শন মধ্য এশিয়া ও চীনের প্রত্নস্থলেও পাওয়া গেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এগুলোই পরবর্তী যুগের প্যাচওয়ার্কের ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ, প্যাচওয়ার্কের ইতিহাস কোনো এক দেশের নয়। এটি মানবসভ্যতার প্রায় সর্বজনীন এক উদ্ভাবন।

মরুভূমি থেকে সিল্ক রোড

প্যাচওয়ার্কের বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল সিল্ক রোড। চীন থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এ বাণিজ্যপথে শুধু রেশম, মসলা কিংবা ধাতু নয়, ভ্রমণ করেছিল ধারণা, প্রযুক্তি এবং শিল্পরীতিও।

বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কাপড় জোড়া দেয়ার নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করেছিল। কোথাও তা ছিল ঠান্ডা থেকে রক্ষার উপায়, কোথাও যুদ্ধের পোশাক শক্ত করার কৌশল, আবার কোথাও ধর্মীয় বস্ত্র সংরক্ষণের মাধ্যম। তবে মূল দর্শন ছিল একই- ‘কিছুই নষ্ট হবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর প্যাচওয়ার্ক ঐতিহ্যের একটি তৈরি হয়েছিল জাপানে। এর নাম ’বোড়ো’। জাপানি ভাষায় বোড়ো শব্দের অর্থ প্রায় ‘ছেঁড়া’ বা ‘জীর্ণ’।

১৭-১৯শ শতকের মধ্যে জাপানের দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলো নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য রাখত না। একটি পোশাক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহার হতো। যখনই কোথাও ছিঁড়ে যেত, সেখানে নতুন কাপড়ের টুকরো বসিয়ে বিশেষ সেলাই-সাশিকো দিয়ে শক্ত করা হতো।

ইউরোপে প্যাচওয়ার্কের নতুন রূপ

মধ্যযুগে ইউরোপে ক্রুসেড থেকে ফিরে আসা সৈন্যরা পূর্বাঞ্চলের স্তরযুক্ত কাপড় ও কুইল্টিং কৌশলের সঙ্গে পরিচিত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এর পর থেকেই ইউরোপে কুইল্টিং ও কাপড়ের স্তর সেলাইয়ের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরবর্তী শতাব্দীতে, বিশেষ করে ১৭শ ও ১৮শ শতকে, কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে জ্যামিতিক নকশা তৈরির প্রবণতা ইংল্যান্ডে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে এটি ছিল অভিজাতদের শিল্প। কারণ রঙিন কাপড় ছিল ব্যয়বহুল। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর যখন বস্ত্র উৎপাদন সহজ ও সস্তা হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের ঘরেও প্যাচওয়ার্ক পৌঁছে যায়।

আমেরিকা প্যাচওয়ার্ককে বদলে দিল

সম্ভবত পৃথিবীর কোনো দেশ প্যাচওয়ার্ককে যুক্তরাষ্ট্রের মতো জনপ্রিয় করে তুলতে পারেনি। ১৭শ শতকে ইউরোপীয় অভিবাসীরা এই শিল্প নিয়ে নতুন পৃথিবীতে আসেন। কিন্তু সেখানে এটি শুধু কম্বল তৈরির কৌশল হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে ওঠে পারিবারিক স্মৃতির ভাণ্ডার, নারীদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা, যুদ্ধের স্মারক, এমনকি পারিবারিক উত্তরাধিকার। ‘কুইল্টিং বি’ নামে নারীদের সমবেত হয়ে কুইল্ট তৈরির সংস্কৃতি আমেরিকার সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। প্রতিটি কাপড়ের টুকরো হয়তো এসেছে একটি শিশুর পোশাক, কারো বিয়ের গাউন কিংবা কোনো মৃত স্বজনের শার্ট থেকে। ফলে একটি কুইল্ট হয়ে উঠত পরিবারের জীবন্ত ইতিহাস।

মহামন্দা এবং প্যাচওয়ার্কের পুনর্জন্ম

১৯৩০-এর দশকের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ প্যাচওয়ার্ককে আবারো ফিরিয়ে আনে প্রয়োজনের জায়গায়। অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ নতুন কাপড় কেনা কমিয়ে দেয়। পুরোনো পোশাক কেটে তৈরি হতে থাকে নতুন কুইল্ট। কিন্তু এবার একটি পার্থক্য ছিল। এটি শুধু দারিদ্র্যের প্রতীক নয়, বরং সৃজনশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই সময় থেকেই রঙ, জ্যামিতি এবং নকশা নিয়ে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়, যা আধুনিক প্যাচওয়ার্ক ডিজাইনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

বাংলার কাঁথা: প্যাচওয়ার্ক কি আসলে বাংলাদেশের নিজেরই শিল্প?

"যে শিল্পকে আজ আমরা 'প্যাচওয়ার্ক' নামে চিনি, বাংলার নারীরা হয়তো শত শত বছর আগে সেটিই করতেন-তবে তারা একে শিল্প বলতেন না। বলতেন কাঁথা।" পৃথিবীর ইতিহাসে প্যাচওয়ার্কের জন্ম হয়েছিল প্রয়োজন থেকে। বাংলাতেও গল্পটা একই। কিন্তু এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

ইউরোপে যেখানে প্যাচওয়ার্ক ধীরে ধীরে জ্যামিতিক নকশা, কুইল্ট এবং অলংকারমূলক বস্ত্রশিল্পে পরিণত হয়েছিল, বাংলায় কাপড় জোড়া দেয়ার সেই প্রয়োজন একসময় রূপ নেয় এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শিল্পধারায়, তা হল কাঁথা।

তাই বাংলাদেশের প্যাচওয়ার্কের ইতিহাস খুঁজতে গেলে শুধু আধুনিক বুটিক, ফ্যাশন হাউস কিংবা হস্তশিল্প মেলায় গেলে হবে না। ফিরে যেতে হবে গ্রামের উঠোনে, যেখানে একজন মা, একজন দাদি কিংবা একজন নানি পুরোনো শাড়ি স্তরে স্তরে বিছিয়ে সুই-সুতোর আঁচড়ে নিজের জীবনকথা লিখে রাখতেন।

কাঁথার জন্ম: অভাবের ভেতর শিল্পের আবিষ্কার

বাংলার গ্রামীণ জীবনে কাপড় ছিল অমূল্য সম্পদ। একটি শাড়ি বছরের পর বছর ব্যবহার হতো। ছিঁড়ে গেলে তা ছোটদের পোশাক বানানো হতো। তারপর রান্নাঘরের কাপড়। শেষে তারও যখন আর ব্যবহার থাকত না, তখন কয়েকটি পুরোনো শাড়ি, ধুতি বা লুঙ্গি একসঙ্গে স্তরে স্তরে রেখে সূক্ষ্ম রানিং স্টিচ দিয়ে সেলাই করে তৈরি হতো একটি কাঁথা। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। শুরুতে কাঁথা ছিল বস্ত্র পুনর্ব্যবহারের একটি উপায়। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি শুধু কম্বল বা বিছানার চাদর হয়ে থাকেনি। নারীরা সেই কাপড়ের ওপর ফুল এঁকেছেন, পাখি এঁকেছেন, নৌকা এঁকেছেন, মাছ,পদ্ম, বিয়ের দৃশ্য, ধর্মীয় প্রতীক, লোককথা, এমনকি নিজের স্বপ্নও এঁকেছেন সুতোর মাধ্যমে।

আজ আমরা নকশিকাঁথাকে সাধারণভাবে এমব্রয়ডারি বা সূচিশিল্প বলি। কিন্তু গবেষকরা দেখিয়েছেন, কাঁথার ইতিহাস তার চেয়েও অনেক গভীর। বিশিষ্ট গবেষক নিয়াজ জামান, যিনি কাঁথা নিয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন, তাঁর মতে, ‘কাঁথার সবচেয়ে প্রাচীন রূপ সম্ভবত ছিল প্যাচওয়ার্ক কাঁথা। অর্থাৎ, শুরুতে শুধু পুরোনো কাপড় স্তরে স্তরে রাখা হতো না, অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাপড়ের টুকরো জোড়া লাগিয়েও কাঁথা তৈরি করা হতো। পরে সেই কাপড়ের ওপর অ্যাপ্লিক, নকশা এবং সূচিশিল্প যোগ হতে থাকে। তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় কাপড় জোড়া দেয়ার শিল্প কেবল পাশ্চাত্যের প্রভাবে আসেনি, এর নিজস্ব, বহু পুরোনো একটি ধারা ছিল।’

যেহেতু বাংলার আর্দ্র জলবায়ু, বৃষ্টি, পোকামাকড় এবং তুলার স্বাভাবিক ক্ষয়ের কারণে কয়েক শতাব্দী পুরোনো বস্ত্র প্রায় কখনোই সংরক্ষিত থাকে না।

ফলে ইতিহাসবিদরা কাঁথার বয়স নির্ধারণ করেন সাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত, লোকস্মৃতি, সংগ্রহশালা, এবং বিরল সংরক্ষিত নমুনার মাধ্যমে। নিয়াজ জামানসহ একাধিক গবেষকের মতে, ষোড়শ শতকের শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত-এ কাঁথার উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে উনিশ শতকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক নথিতেও বাংলার কাঁথার উল্লেখ দেখা যায়। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে কাঁথা তখন সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি জীবনের পরিচিত অংশ ছিল। অর্থাৎ, কাঁথা কোনো আধুনিক উদ্ভাবন নয়, এটি বাংলার দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ।

কাঁথা থেকে আধুনিক প্যাচওয়ার্ক

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে একটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন হস্তশিল্প প্রকল্প শুরু করা হয়। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আড়ং, যার লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ কারুশিল্পীদের ন্যায্য মূল্য দেয়া এবং তাদের পণ্য শহুরে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। কাঁথা আর শুধু শীতের কম্বল রইল না। এটি হয়ে উঠল- শাড়ি, ওড়না, ব্যাগ, কুশন, ওয়াল হ্যাংগিং, টেবিল রানার, জ্যাকেট, স্কার্ফ, ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্যাচওয়ার্ক, অ্যাপ্লিক এবং সমকালীন টেক্সটাইল ডিজাইনের প্রভাবও যুক্ত হতে থাকে। পুরোনো কাপড়ের বদলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন কাপড় ব্যবহার করা হলেও, কাঁথার মূল দর্শন-হাতে সেলাই, গল্প বলা, এবং নকশার মাধ্যমে স্মৃতি বহন করা—অটুট থাকে।

গ্রামের উঠোন থেকে বৈশ্বিক বাজারে: বাংলাদেশের আধুনিক প্যাচওয়ার্কের উত্থানের গল্প

‘যে শিল্প একসময় ছিল সংসারের প্রয়োজন, আজ সেটিই বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।’ একসময় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ ঘরেই সুই-সুতো ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শীতের জন্য কাঁথা বানানো, পুরোনো কাপড় জোড়া দেওয়া, ছেঁড়া অংশে নতুন কাপড় বসানো-এসব ছিল গৃহস্থালির স্বাভাবিক কাজ। এর জন্য কোনো আলাদা বাজার ছিল না, কোনো ব্র্যান্ড ছিল না, এমনকি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতিও ছিল না। আজ সেই একই দক্ষতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ডিজাইনার শাড়ি, জ্যাকেট, কুশন, ব্যাগ, ওয়াল আর্ট, এমনকি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া টেক্সটাইল ইনস্টলেশন। এই পরিবর্তন হঠাৎ আসেনি। এর পেছনে রয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, নারীর কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং সাম্প্রতিক সময়ে টেকসই ফ্যাশনের বৈশ্বিক উত্থান।

কখন ‘প্যাচওয়ার্ক’ শব্দটি জনপ্রিয় হলো?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশে শত শত বছর ধরে কাঁথা তৈরি হলেও ‘প্যাচওয়ার্ক’ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় মূলত ১৯৯০-এর দশকে। কারণ তখন কয়েকটি পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটে-আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের প্রভাব, বুটিক সংস্কৃতির বিস্তার ,ফ্যাশন ডিজাইনের শিক্ষা, বিদেশী ক্রেতাদের আগ্রহ, রফতানিমুখী হস্তশিল্প শিল্পের বিকাশ। এর ফলে পশ্চিমা প্যাচওয়ার্কের জ্যামিতিক নকশা, অ্যাপ্লিক, রঙের বিন্যাস এবং ডিজাইন ভাষা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কাঁথার সঙ্গে মিশতে শুরু করে।

আজ আমরা যে প্যাচওয়ার্ক ব্যাগ, প্যাচওয়ার্ক কুশন ও প্যাচওয়ার্ক জ্যাকেট দেখি-তার অনেকটাই এই সমকালীন সংমিশ্রণের ফল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: নতুন যুগের মোড়

বাংলাদেশে প্যাচওয়ার্কের সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম। দশ বছর আগেও একজন কারুশিল্পীর বাজার সীমাবদ্ধ ছিল স্থানীয় হাট বা দোকানে। আজ একটি ছোট গ্রামের উদ্যোক্তাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সারা দেশে এমনকি বিদেশেও পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। এর ফলে প্যাচওয়ার্ক আর শুধু বড় ব্র্যান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছোট উদ্যোক্তা, নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসা এবং হোম-বেইজড ব্র্যান্ডও এই শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে। একসময় প্যাচওয়ার্ককে অনেকে ‘পুরোনো দিনের জিনিস’ ভাবতেন। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

চ্যালেঞ্জও কম নয়

তবে এই শিল্পের সামনে বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। দক্ষ কারিগরের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। হাতে তৈরি পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের তুলনায় অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। বাজারে মেশিনে তৈরি ‘প্যাচওয়ার্ক-স্টাইল’ পণ্যের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই নকশা ও কারিগরের মেধাস্বত্ব সুরক্ষিত নয়। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এই কাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন। যদি প্রশিক্ষণ, নকশা উন্নয়ন এবং ন্যায্য বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের গল্পটি আসলে কী?

এই তিন পর্বের যাত্রা শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। প্যাচওয়ার্ক কি বাংলাদেশে এসেছে, নাকি বাংলাদেশ বরাবরই প্যাচওয়ার্ক জানত? উত্তরটি সরল নয়।

ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা প্যাচওয়ার্ক যেখানে জ্যামিতিক নকশায় বিভিন্ন কাপড় জোড়া দিয়ে অলংকারমূলক টেক্সটাইল তৈরি করা হয়, তার বিকাশ ইউরোপ ও আমেরিকায় একটি স্বতন্ত্র ধারায় হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলার কাঁথা বিকশিত হয়েছে স্থানীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায়। এর মূল ভিত্তি ছিল পুরোনো কাপড়ের পুনর্ব্যবহার, স্তরবিন্যাস এবং হাতে সেলাই। কিছু প্রাচীন কাঁথায় কাপড় জোড়া দেয়ার (প্যাচিং) কৌশলও দেখা যায়, তবে বাংলার কাঁথাকে সরাসরি পাশ্চাত্য প্যাচওয়ার্কের সমার্থক বলা ইতিহাসগতভাবে সঠিক নয়। বরং এ দুটি ঐতিহ্য আলাদা উৎস থেকে বিকশিত হয়ে আধুনিক যুগে এসে একে অপরকে প্রভাবিত করেছে।

আজ বাংলাদেশের যে ‘প্যাচওয়ার্ক’ আমরা দেখি, তা মূলত তিনটি ধারার মিলন — বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁথা, আন্তর্জাতিক প্যাচওয়ার্ক নকশা, এবং সমকালীন টেকসই ফ্যাশনের দর্শন। সম্ভবত এ কারণেই বাংলাদেশের আধুনিক প্যাচওয়ার্ক শুধু একটি হস্তশিল্প নয়, এটি অতীত ও বর্তমান, লোকঐতিহ্য ও বৈশ্বিক নকশা, প্রয়োজন ও নান্দনিকতার এক সৃজনশীল সংলাপ।

আরও