শহরের ব্যস্ততম সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে কয়েকটি ছোট হাত গাড়ির জানালার কাছে এসে থামে। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে পানির বোতল, কেউ শুধু হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সিগন্যাল ছেড়ে দিলে গাড়ি চলে যায়, শিশুটিও সরে যায় অন্য গাড়ির দিকে। শহরের কাছে এটি প্রতিদিনের দৃশ্য। এত পরিচিত যে এখন আর আমাদের চোখে পড়ে না।
এ দৃশ্যের ভেতরে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে—শিশুগুলো এখানে কেন?
প্রশ্নটি সহজ নয়। কারণ ‘পথশিশু’ বললেই একটি অভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বোঝানো যায় না। কেউ রাস্তায় কাজ করে কিন্তু রাতে পরিবারের কাছে ফিরে যায়। কেউ আশ্রয়কেন্দ্র বা অস্থায়ী আবাসে থাকে। আবার কেউ সত্যিই রাস্তাকেই নিজের ঘর হিসেবে গ্রহণ করেছে। একক গবেষণায় পথশিশুদের এ ভিন্নতার কারণে তাদের একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং সঠিক সংখ্যা গণনা, দুটিই কঠিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পথশিশুকে আমরা প্রায়ই একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখি। অথচ সমস্যাটি শিশুটির মধ্যে নয়; তার চারপাশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে। সে রাস্তায় এসেছে দারিদ্র্যের কারণে, পারিবারিক ভাঙনের কারণে, নির্যাতন বা অবহেলার কারণে, কিংবা পরিবারের টিকে থাকার প্রয়োজনেই—প্রতিটি শিশুর গল্প আলাদা হতে পারে। তাই পথশিশুকে কেবল ‘ভিক্ষুক’, ‘অপরাধপ্রবণ’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার পরিবর্তে একটি সামাজিক পূর্বধারণাকেই শক্তিশালী করে।
রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশুর জীবনকে বুঝতে হলে আমাদের ‘রাস্তা’ শব্দটির অর্থও বদলাতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে রাস্তা চলাচলের জায়গা। পথশিশুর কাছে সেটি কর্মস্থল, সামাজিক পরিসর, কখনো আশ্রয়, কখনো খাদ্যের উৎস, কখনো বন্ধুত্বের জায়গা। অর্থাৎ রাস্তা তার জীবনের বাইরের কোনো স্থান নয়; সেটিই তার জীবনযাপনের অবকাঠামো।
এ বাস্তবতা তাদের আচরণকেও বদলে দেয়। যে শিশু নিরাপদ পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার কাছে ভবিষ্যৎ বলতে শিক্ষা ও কর্মজীবনের একটি ধারাবাহিক পথ থাকে। পথে বেড়ে ওঠা শিশুর কাছে ভবিষ্যৎ অনেক বেশি অনিশ্চিত। আজ কোথায় কাজ পাওয়া যাবে, রাতে কোথায় ঘুমানো যাবে, কে খাবার দেবে, কার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে—তাৎক্ষণিক এ প্রশ্নগুলোই তার সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বাংলাদেশের নগর বাস্তবতায় এ ধারণাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের শহরে অর্থনৈতিক বৈষম্য যেমন বাড়ছে, তেমনি একই শহরের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে একাধিক বাস্তবতা। একদিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবন, অন্যদিকে সেই ভবনের ছায়ায় রাত কাটানো শিশু। একদিকে ডিজিটাল শিক্ষা, অন্যদিকে এমন শিশু যে নিজের নাম লিখতে শেখার সুযোগও পায়নি। এ বৈপরীত্যকে শুধু মানবিক বেদনার ছবি হিসেবে দেখলে হবে না। এটি অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক সুরক্ষারও প্রশ্ন
জার্নাল অব হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়ার্কে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘স্ট্রিট চিলড্রেন গেটিং টু নো দেম’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, রাস্তায় থাকা শিশুরা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের টিকে থাকার কৌশল তৈরি করে। তারা জানে কোথায় মানুষের আনাগোনা বেশি, কোথায় দান পাওয়া যায়, কোথায় কাজ পাওয়া সম্ভব। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার সম্পর্কও তৈরি হয়। অর্থাৎ সমাজ যাদের ‘অসহায়’ বলে দেখে, তাদের নিজেদেরও একটি সামাজিক কাঠামো রয়েছে।
কিন্তু এ কাঠামো সবসময় নিরাপদ নয়। দীর্ঘদিন পথে থাকা শিশুদের একটি অংশ বয়সে বড় ও প্রভাবশালী শিশুদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ে। সুরক্ষার বিনিময়ে তাদের দিয়ে চুরি, অবৈধ পণ্য বিক্রি কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্তও করানো হয়। গবেষণায় এমন গোষ্ঠীগত সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে, যেখানে অপেক্ষাকৃত ছোট শিশুরা নিরাপত্তার জন্য বড়দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সে নির্ভরতাই পরে শোষণের সুযোগ তৈরি করে।
অর্থাৎ যে শিশু পরিবার থেকে নিরাপত্তা পায়নি, সে রাস্তার একটি বিকল্প ‘পরিবারে’ আশ্রয় নেয়। কিন্তু সে পরিবারও কখনো তাকে রক্ষা করে, কখনো তাকে ব্যবহার করে।
এখানে মাদক ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের প্রসঙ্গটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গবেষণাপত্রে দ্রাবকজাতীয় আঠা (ড্যান্ডি বা জুতার আঠা) শোঁকার মতো আচরণের কথা বলা হয়েছে। ক্ষুধা, ঠান্ডা, ভয় ও হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে কিছু শিশু এসব পদার্থ ব্যবহার করে। কিন্তু এ সাময়িক স্বস্তি তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাহলে সমাধান কী? এ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিলে সবচেয়ে সহজ যে উত্তরটি আসবে, তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু এটিই সবচেয়ে অসম্পূর্ণ উত্তর। কারণ একটি শিশুকে ফুটপাত থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও বসিয়ে দিলেই তার পথশিশু হয়ে ওঠার কারণগুলো দূর হয় না। তার পরিবার যদি অনাহারে থাকে, যদি ঘরে নির্যাতন থাকে, যদি কোনো আয় না থাকে, যদি স্কুলে ফেরার সুযোগ না থাকে, তাহলে সে আবার রাস্তায়ই ফিরে আসবে। ফলে পথশিশু পুনর্বাসনকে শুধু আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার অভিযান বা সাময়িক খাদ্য বিতরণের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো যায় না।
শিক্ষা শুধু বই পড়ার ব্যবস্থা নয়; এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরও একটি মাধ্যম। গবেষণাপত্রে বৈচিত্র্য, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুর পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক শ্রেণি বা জীবনযাপনের কারণে তাকে ছোট করা যাবে না। বরং তার অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে
তাহলে কী করা যাবে? এ প্রশ্নের যুক্তিসংগত জবাব হতে পারে, শিশুটিকে একজন অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা। আর এখানে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে, ‘স্কুলে ভর্তি’ এবং ‘শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা’ এক বিষয় নয়। যে শিশু দিনের বড় অংশ রাস্তায় কাজ করে, তার জন্য প্রচলিত বিদ্যালয়ব্যবস্থা কতটা উপযোগী—এ প্রশ্নও সামনে আনতে হবে। তার জন্য নমনীয় সময়সূচি, ব্রিজিং শিক্ষা, খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং এবং নিরাপদ আবাসনের মতো সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শিক্ষা শুধু বই পড়ার ব্যবস্থা নয়; এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরও একটি মাধ্যম। গবেষণাপত্রে বৈচিত্র্য, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুর পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক শ্রেণি বা জীবনযাপনের কারণে তাকে ছোট করা যাবে না। বরং তার অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
বাংলাদেশের নগর বাস্তবতায় এ ধারণাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের শহরে অর্থনৈতিক বৈষম্য যেমন বাড়ছে, তেমনি একই শহরের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে একাধিক বাস্তবতা। একদিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবন, অন্যদিকে সেই ভবনের ছায়ায় রাত কাটানো শিশু। একদিকে ডিজিটাল শিক্ষা, অন্যদিকে এমন শিশু যে নিজের নাম লিখতে শেখার সুযোগও পায়নি। এ বৈপরীত্যকে শুধু মানবিক বেদনার ছবি হিসেবে দেখলে হবে না। এটি অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক সুরক্ষারও প্রশ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পথশিশুকে ‘উদ্ধার’ করার ভাষার পাশাপাশি ‘শোনা’র ভাষা তৈরি করা জরুরি। তাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণাটিও নীতিনির্ধারণ ও শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের নিজস্ব কণ্ঠ ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। কারণ যে শিশু প্রতিদিন শহরকে এত কাছ থেকে দেখে, শহর সম্পর্কে তার নিশ্চয়ই কিছু বলার আছে।
সে জানে কোন ফুটপাত রাতে নিরাপদ। জানে কোন দোকানের সামনে খাবার মেলে। জানে কোন সিগন্যালে গাড়ির কাচ নামে। জানে কোন মানুষ টাকা দেয়, কে তাড়িয়ে দেয়। সে জানে পুলিশ দেখলে কোথায় সরে যেতে হয়। জানে কে তাকে রক্ষা করবে এবং কে তার কাছ থেকে টাকা নেবে।
এ জ্ঞান কোনো শিশুর অর্জন করার কথা ছিল না। কিন্তু জীবন তাকে শিখিয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য শিশুকে এ জ্ঞান অর্জন করতে না হয়।