বাইরের বাতাস কতটা দূষিত, তা নিয়ে আমাদের চিন্তার শেষ নেই। রাস্তায় বের হলে মাস্ক পরি, ধুলাবালি এড়িয়ে চলি, জানালা বন্ধ রাখি। ঘরকে মনে করি সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, ঘরে আমাদের এমন কিছু কাজ করতে হয় যা ভেতরের বাতাসকেও দূষিত করছে?
রান্নার সময় গ্যাসের চুলা জ্বালানো, তেলে ভাজা, মশার কয়েল বা ধূপ জ্বালানো, স্প্রে ব্যবহার, ফ্লোর কিংবা গ্লাস ক্লিনারের ব্যবহার ঘরের ভেতর ক্ষতিকর রাসায়নিক বা সূক্ষ্ম কণা ছড়িয়ে দিতে পারে।
ঘরের ভেতরের দূষণের অন্যতম বড় উৎস রান্নাঘর। গ্যাসের চুলায় রান্নার সময় নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও অতিক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কণা এতই সূক্ষ্ম যে নাক ও গলার স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা পেরিয়ে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণের সঙ্গে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা, এমনকি মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গ্যাসের পাশাপাশি অনেক পরিবারে এলপিজি, কাঠ, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করলে ধোঁয়া ও অন্যান্য দূষক ঘরের ভেতরেই জমে থাকতে পারে। তাই রান্নার সময় এক্সহস্ট ফ্যান চালু রাখা, সম্ভব হলে জানালা খোলা এবং রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
শুধু রান্নাই নয়, ঘরকে ‘পরিষ্কার’ রাখতে গিয়ে আমরা অনেক সময় বাতাসে রাসায়নিক ছড়িয়ে দিই। বিভিন্ন ধরনের ক্লিনার, এয়ার ফ্রেশনার, বডি স্প্রে, পারফিউম, সুগন্ধি মোমবাতি, এসেনশিয়াল অয়েল কিংবা রুম ফ্রেশনার থেকে উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা ভিওসি বাতাসে ছড়াতে পারে। এগুলো ঘরের অন্য রাসায়নিকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আরো ক্ষুদ্র কণা বা ফর্মালডিহাইডের মতো ক্ষতিকর পদার্থ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ‘ঘর থেকে গন্ধ দূর করার’ জন্য সারাক্ষণ এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করার অভ্যাস নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। ঘর সুগন্ধি হলেই যে বাতাস পরিষ্কার হচ্ছে, এমন নয়।
পরিষ্কার করার ক্ষেত্রেও স্প্রে সরাসরি বাতাসে ছড়িয়ে দেয়ার বদলে কাপড়ে বা পরিষ্কার করার উপকরণে নিয়ে ব্যবহার করা তুলনামূলক ভালো। পরিষ্কার করার পর জানালা খুলে ঘরের বাতাস চলাচলের সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে।
ঘরের আরেকটি অদৃশ্য সমস্যা হতে পারে আসবাব ও নরম সামগ্রী। সোফা, গদি, কার্পেট, পর্দা, বালিশ কিংবা ফোমজাত পণ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক ধীরে ধীরে ঘরের ধুলা ও বাতাসে মিশতে পারে। বিশেষ করে কিছু ফ্লেম রিটার্ড্যান্ট বা অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির উদ্বেগ রয়েছে। এসব রাসায়নিকের কিছু হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং শিশুদের বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন সোফা, গদি বা ফার্নিচার কেনার সময় তাই শুধু নকশা, দাম ও আরাম নয়— ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কেও ধারণা নেয়া ভালো। একইসঙ্গে ঘরের ধুলা নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। ভেজা কাপড় দিয়ে ধুলা মোছা এবং সম্ভব হলে হেপা ফিল্টারযুক্ত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করা যেতে পারে।
মেঝের উপকরণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভিনাইল বা কিছু প্লাস্টিকজাত মেঝেতে ব্যবহৃত প্লাস্টিসাইজার ধীরে ধীরে বের হয়ে ধুলার সঙ্গে মিশতে পারে। ছোট শিশুরা যেহেতু মেঝেতে বেশি সময় কাটায় এবং হাত মুখে দেয়ার প্রবণতা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শের সুযোগ তুলনামূলক বেশি।
রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিলেও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। নন-স্টিক পাত্রের আবরণ আঁচড় পড়ে নষ্ট হলে বা অতিরিক্ত গরম হলে এর উপাদান নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির উদ্বেগ রয়েছে। তাই আঁচড় পড়া বা বাঁকা হয়ে যাওয়া নন-স্টিক পাত্র ব্যবহার না করাই ভালো। সম্ভব হলে স্টিল বা লোহার পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। নন-স্টিক পাত্রে ধাতব খুন্তি বা চামচ ব্যবহার না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্লাস্টিকের পাত্র ও খাবার সংরক্ষণের বক্স নিয়েও সচেতন হওয়া দরকার। কিছু প্লাস্টিকে থাকা বিসফেনলজাত রাসায়নিক খাবারে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, বিশেষ করে গরম করলে। তাই মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করার ক্ষেত্রে কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
আরেকটি পরিচিত সমস্যা ছত্রাক বা মোল্ড। বর্ষাকাল, আর্দ্র আবহাওয়া এবং অনেক ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের অভাবে দেয়াল, ছাদ, আলমারি বা আসবাবে স্যাঁতসেঁতে ভাব জমে থাকলে ছত্রাক জন্মাতে পারে। এর ফলে অ্যালার্জি, চোখ-নাকের জ্বালা কিংবা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে।
কাপড় ঘরের ভেতর দীর্ঘ সময় শুকানো, গোসলের পর বাথরুমের দরজা-জানালা বন্ধ রাখা কিংবা রান্নার পর রান্নাঘরে বাষ্প জমে থাকা—এসবও ঘরের আর্দ্রতা বাড়ায়। তাই সম্ভব হলে কাপড় বাইরে শুকানো, রান্না ও গোসলের পর জানালা খোলা এবং এক্সহস্ট ফ্যান ব্যবহার করা উচিত।