মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক থাকে যা একইসঙ্গে শীতল ছায়া দেয়, আবার সর্বনাশা তুফান হয়েও আছড়ে পড়ে। অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতিকথা ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার এ চরম সত্যেরই মুখোমুখি হন। বইটির পাতায় পাতায় যে মানুষটি সবচেয়ে প্রবলভাবে উপস্থিত, তিনি অরুন্ধতী রায়ের মা মেরি রায়। অরুন্ধতীর ভাষায়, তার মা ছিলেন এমন এক সত্তা, যিনি তার জন্য একইসঙ্গে ছিলেন ‘আশ্রয়’ এবং ‘ঝড়’।
পৃথিবীর প্রচলিত নিয়মে মায়ের কোল যেখানে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে মেরি রায় ছিলেন এমন এক আশ্রয়স্থল, যার প্রতিটি ইটে মিশে ছিল বিদ্রোহের বারুদ। তিনি যেমন তার সন্তানদের সমাজের রক্তচক্ষু থেকে আগলে রেখেছেন, তেমনি নিজের প্রবল ব্যক্তিত্বের ঝড়ে তছনছ করে দিয়েছেন তাদের শান্তিও। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ‘মা’ শব্দটির সঙ্গে আত্মত্যাগ মিলিয়ে যে দেবীর রূপ দিয়েছে, এ বইয়ে অরুন্ধতী রায় তেমন কোনো দেবীর আরাধনা করেননি। বরং রক্ত-মাংসের এক নারীর গল্প বলেছেন, যিনি পিতৃতন্ত্রের শিকল ভেঙে যেমন আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলেন, তেমনি সেই বিদ্রোহের আগুনে দগ্ধ করেছিলেন তার চারপাশের আপনজনদেরও।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতিকথা ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ সমকালীন সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। প্রায় চার দশক ধরে অরুন্ধতী রায় আমাদের কাছে পরিচিত ক্ষুরধার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর মতো বুকারজয়ী উপন্যাসের জন্য। কিন্তু এ বইয়ে তিনি নিজের বর্ম খুলে পাঠককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তার অত্যন্ত ব্যক্তিগত এক জগতে— যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তার মা কিংবদন্তি সমাজকর্মী মেরি রায়। বইটিতে কেরালার জটিল শৈশব থেকে সাহিত্যিক খ্যাতি এবং অ্যাকটিভিজম পর্যন্ত তার যাত্রার গল্প রয়েছে। গ্রন্থটি কেবল একটি আত্মজীবনী নয়; এটি একটি মেয়ের তার মাকে নতুন করে চেনার চেষ্টা, এক জটিল সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক আজন্ম সংগ্রামের দলিল।
বইটির মূল ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে মেরি রায়ের অদম্য জীবনকে ঘিরে। ১৯৩০-এর দশকের কেরালায় এক রক্ষণশীল সিরিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে মেরির বেড়ে ওঠা। তখনকার সেই সমাজ ছিল চরম পুরুষতান্ত্রিক। কীটতত্ত্ববীদ বাবার অত্যাচারের বলয় থেকে বের হতে মেরি রায় বিয়ে করেছিলেন এক বাঙালি হিন্দু পুরুষকে। চা বাগানের কর্মকর্তা মদ্যপ স্বামীর সঙ্গে সেই সংসার টেকেনি। দুই সন্তান—অরুন্ধতী ও তার ভাইকে নিয়ে তাদের মেরি রায় ফিরে যায় প্রথমে উটি ও পরে কেরালায়।
অরুন্ধতী বর্ণনা করেছেন, কীভাবে একজন একা নারী হিসেবে তার মাকে নিজের পরিবার এবং সমাজের গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতেও তাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। এ ‘গৃহহীনতা’র বোধই মেরিকে একজন লড়াকু মানুষে পরিণত করেছিল।
বইটির একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে মেরি রায়ের সেই ঐতিহাসিক আইনি লড়াই, যা ভারতের আইনি ইতিহাসে ‘মেরি রায় মামলা’ (১৯৮৬) নামে পরিচিত। কেরালায় তখন প্রচলিত ছিল, বাবার সম্পত্তিতে মেয়েরা কোনো অধিকার পাবে না। মেরি রায় এ বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং জয়ী হন। অরুন্ধতী অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন, এ লড়াই কেবল অর্থের জন্য ছিল না; এটি ছিল একজন নারীর অস্তিত্ব ও মর্যাদার লড়াই। তবে এর পেছনে মেরির ব্যক্তিগত জীবনের একাকিত্ব এবং সন্তানদের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপড়েনও সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে।
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো মা ও মেয়ের সম্পর্কের নির্মোহ চিত্রায়ণ। অরুন্ধতী তার মাকে কোনো 'আদর্শ মা' হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং তিনি তুলে ধরেছেন সত্য, বলেছেন মেরি ছিলেন অত্যন্ত আধিপত্যকামী, খামখেয়ালি এবং মানসিকভাবে কঠোর এক নারী। ছোটবেলায় অরুন্ধতী কীভাবে তার মায়ের শাসনের ভয়ে কুঁকড়ে থাকতেন, আবার কীভাবে মায়ের সাহসিকতা দেখেই নিজের লেখক সত্তার রসদ সংগ্রহ করতেন তার এক চমৎকার দ্বন্দ্ব এখানে ফুটে উঠেছে। অরুন্ধতী লিখেছেন যে, তিনি তার জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন মায়ের ছায়া থেকে দূরে পালিয়ে বেড়াতে। অথচ শেষ পর্যন্ত তিনি আবিষ্কার করেন, তার ভেতরের সেই বিপ্লবী সত্তা আসলে তার মায়েরই প্রতিচ্ছবি। ‘I left my mother not because I didn’t love her, but in order to be able to continue to love her. ’ মা-মেয়ের টানেপড়েনের সেই চিত্রি ফুটে উঠেছে এ লাইনে।
পাঠকরা এই বইটিতে তাদের প্রিয় উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাবেন। সেই কেরালা, আয়মেনেম গ্রাম, মীনাচিল নদী এবং পারিবারিক রেষারেষি- সবই এখানে বাস্তব রূপে হাজির। উপন্যাসের চরিত্র ‘আম্মু’র সঙ্গে মেরি রায়ের মিল এবং অমিলগুলো অরুন্ধতী এখানে ব্যাখ্যা করেছেন। এটি যেন সেই কালজয়ী উপন্যাসের একটি 'নন-ফিকশন' পরিশিষ্ট।
অরুন্ধতী রায় ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতির বাইরে দেখেন না। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কেরালায় কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং সিরিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের রক্ষণশীলতা মেরি রায়ের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। জাতিভেদ প্রথা, লিঙ্গবৈষম্য এবং শিক্ষার গুরুত্ব—এ বিষয়গুলো ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই চলে এসেছে। উঠে এসেছে তার জীবনের সংগ্রাম। নর্মদা বাচাও আন্দোলন, নকশালদের সঙ্গে পাহাড়ে কাটানো জীবন, আদালত অবমাননার দায়ে জেলে থাকা একদিন। বইটির শেষ দিকে অরুন্ধতী যখন মায়ের বার্ধক্য ও অসুস্থতার বর্ণনা দেন, তখন তা অত্যন্ত করুণ এবং মানবিক হয়ে ওঠে। একজন প্রচণ্ড শক্তিশালী নারী যখন ধীরে ধীরে স্মৃতিভ্রংশ এবং শারীরিক দুর্বলতার কাছে হার মানেন, তখন মেয়ের চোখে তাঁর যে নতুন রূপ ফুটে ওঠে, তা পাঠককে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
‘মাদার মেরি কামস টু মি’ একটি সাহসী বই। অরুন্ধতী রায় এখানে নিজের দুর্বলতা, মায়ের প্রতি তাঁর ক্ষোভ এবং গভীর ভালোবাসাকে অকপটে স্বীকার করেছেন। নগ্নভাবে প্রকাশ করেছেন একান্ত ব্যক্তিগত জীবন যেখানে তার শৈশব, কৈশর, যৌবনের আনন্দ, বেদনা, ভয়, ক্ষোভ, মানসিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। লিখেছেন প্রেম, যৌনতা, বিয়ে এমনকি অ্যাবরশনের মতো সামাজিক ট্যাবুতে আড়াল করে রাখা বিষয়ও। বইটির ভাষা কাব্যিক কিন্তু তীক্ষ্ণ।
এটি পাঠককে শেখায় বিদ্রোহের কোনো সহজ পথ নেই। পরিবার যেমন আমাদের শক্তির জায়গা, তেমনি এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতের উৎস। নারীর মুক্তি কেবল আইনি অধিকার নয়, বরং নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার নিরন্তর সংগ্রাম। অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতিকথাটি পড়ার পর পাঠক কেবল মেরি রায়কে চিনবেন না, বরং নিজের ভেতরের মা-সন্তানের সম্পর্কের অপ্রকাশিত দিকগুলো নিয়েও ভাবতে বাধ্য হবেন।
জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নীটশে বলেছিলেন ‘Live dangerously/ বিপজ্জনকভাবে বাঁচো’। আর ফরাসি লেখক আলবেয়ার কাম্যু ১৯৫৭ সালের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন ‘Creat dangerously/ বিপজ্জনকভাবে নির্মাণ কর’। অরুন্ধতী রায় এবং তার মা মেরি রায়ের জীবন ছিল এই দুয়েরই সমন্বয়।
‘মাদার মেরি কামস টু মি’ আর নিছকই অরুন্ধতী রায় নামক বুকার পুরস্কার জয়ী কোনো অসামান্য ভারতীয় লেখকের স্মৃতিকথা হয়ে থাকেনা। অরুন্ধতী রায়ের খুড়ধার লেখনীতে, লিনিয়ার ও নন-লিনিয়ার বর্ণনায় হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উপন্যাস যার প্রতিটি অধ্যায়ে পাঠক হেঁটে যায় প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে। কেরালা থেকে দিল্লি, স্লাইডিং-ফোল্ডিং স্কুল থেকে আর্কিটেকচার স্কুল। আর দেশ-কাল-রাষ্ট্র-কাঁটাতারের সীমা পেরিয়ে তা অচিরেই হয়ে ওঠে সেই সব মানুষের বয়ান- যারা বিপজ্জনকভাবে বাঁচতে ও নির্মাণ করতে চেয়াছেন।