স্কুলের সেই বন্ধুর কথা মনে আছে, যার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে দিনই কাটত না; কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আড্ডাসঙ্গী, যার সঙ্গে রাতভর গল্প হতো, একই লেকচার শিট কাড়াকাড়ি করে পড়ে পরীক্ষা দেয়া হতো! নিয়মিত যোগাযোগ হয় পাশের বাসার সেই ‘ডোরবেল ফ্রেন্ড’র সঙ্গে? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা যেন কেমন অদৃশ্য হয়ে গেছে! কোনো ঝগড়া হয়নি, সম্পর্ক ভাঙার ঘোষণাও আসেনি; তবু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর তাদের সঙ্গে কথা হয় না। হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বিনিময়েই সম্পর্ক সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের খুবই স্বাভাবিক বাস্তবতা। আর সে কারণেই পুরোনো বন্ধুত্ব হারানোর বেদনা অনেক সময় প্রেমের সম্পর্ক ভাঙার মতোই গভীর হতে পারে।
মার্কিন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. লরেন গ্রাওয়ার্ট বলছেন, অল্প বয়সে অধিকাংশ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কাছাকাছি থাকার কারণে—স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হোস্টেল, একই কর্মস্থল কিংবা একই পাড়ায় বসবাসের সূত্রে। কিন্তু ত্রিশে পা দেয়ার পর জীবনের অগ্রাধিকার বদলে যায়। কর্মজীবন, সংসার, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব কিংবা অন্য শহর বা দেশে চলে যাওয়ার মতো বাস্তবতা বন্ধুত্বের জন্য বরাদ্দ সময় কমিয়ে দেয়।
মনোবিশেষজ্ঞ মাটকো মোসুনজ্যাক মনে করেন, বিশ থেকে ত্রিশের কোটায় মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ও গড়ে ওঠে। এ সময় মানুষের মূল্যবোধ, জীবনদর্শন ও লক্ষ্য বদলে যায়। ফলে একসময় যাদের সঙ্গে মিল ছিল, পরে তাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বন্ধুত্বের সবচেয়ে কঠিন দিক, অধিকাংশ সম্পর্কই কোনো নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে শেষ হয় না। ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে যায়, ব্যস্ততা বেড়ে যায়, তারপর একসময় সম্পর্কটি কেবল স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা এ অনুভূতিকে ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রিফ’ বা বন্ধুত্ব হারানোর শোক বলে অভিহিত করেন।
ড. গ্রাওয়ার্টের ভাষায়, মস্তিষ্ক বন্ধু হারানোর কষ্টকে অনেকটা অন্য যেকোনো শোকের মতোই অনুভব করে। কারো মৃত্যু না ঘটলেও, সম্পর্কচ্ছেদ না হলেও জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি না থাকায় শোক আরো জটিল হয়ে ওঠে। অনেকেই নিজের মনে নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে থাকেন—আমি কি কোনো ভুল করেছি? সে কি ইচ্ছা করেই দূরে সরে গেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াই কষ্টকে দীর্ঘায়িত করে।
সব বন্ধুত্ব টিকে না থাকা মানেই সম্পর্ক ব্যর্থ—এমন নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনের অভিজ্ঞতা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের ধরনও বদলায়। যাদের জীবনপথ একরকম থাকে, তাদের সম্পর্ক অনেক সময় আরও গভীর হয়। আবার যাদের জীবনের অগ্রাধিকার ভিন্ন হয়ে যায়, তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক।
পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করা অসম্ভব নয়। অনেক সময় একটি ছোট বার্তা—‘তোমার কথা মনে পড়ছিল’—দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, সেই সম্পর্ক আগের জায়গায় ফিরবে—এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো। সময় মানুষকে বদলে দেয়, তাই পুরোনো বন্ধুত্বও নতুন রূপ নিতে পারে।