কম বাজেট, নতুন সংসার

ভাড়া বাসাকে ‘নিজের ঘর’ করে তোলার উপায়

সাজসজ্জার কাজে হাত দেয়ার আগে একবার ভাড়ার চুক্তিপত্রটি দেখে নেয়া ভালো। দেয়ালে পেরেক বা স্ক্রু লাগানো, রং করা কিংবা স্থায়ী কোনো পরিবর্তনের অনুমতি আছে কি না, তা জেনে নিন। বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া কিছু করে ফেললে বাসা ছাড়ার সময় জামানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে ঝামেলা হতে পারে

শহরের অধিকাংশ সংসারই শুরু হয় ভাড়া বাসায় আবাস গড়ার মধ্য দিয়ে। দুই বা তিন রুমের ছোট্ট একটা বাসাকে সবারই নিজের মতো করে সাজানোর ইচ্ছা থাকে। কিন্তু দেয়ালে পেরেক ঠোকা যাবে কি না, রং করা যাবে কি না, কোনো কিছু স্থায়ীভাবে লাগালে বাসা ছাড়ার সময় সমস্যা হবে কি না—এসব চিন্তাও থাকে। ঘর যেন আরামদায়ক ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ হয়, আবার সাজাতে গিয়ে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝামেলাও না হয়—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। বিশেষ করে দেয়ালে স্থায়ী পরিবর্তন, রং করা বা বড় ধরনের সংস্কারে অনেক সময় জামানতের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও সমস্যা হতে পারে।

তবে ঘরকে নিজের মতো করে তুলতে সবসময় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। বরং এমন কিছু সহজ উপায় আছে, যেগুলোতে খরচও কম, আবার বাসা বদলানোর সময় সঙ্গে করে নেওয়াও যায়। একটু পরিকল্পনা আর সৃজনশীলতা থাকলেই সাদামাটা ভাড়া বাসাতেও আনা সম্ভব নিজের ছোঁয়া।

আগে দেখে নিন ভাড়ার চুক্তি

সাজসজ্জার কাজে হাত দেয়ার আগে একবার ভাড়ার চুক্তিপত্রটি দেখে নেয়া ভালো। দেয়ালে পেরেক বা স্ক্রু লাগানো, রং করা কিংবা স্থায়ী কোনো পরিবর্তনের অনুমতি আছে কি না, তা জেনে নিন। বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া কিছু করে ফেললে বাসা ছাড়ার সময় জামানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে ঝামেলা হতে পারে।

কী পরিবর্তন করতে চান, আগে সেটিও ঠিক করে নিন। ঘরের মাপ নেয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি করা এবং কাজ শুরুর আগেই সেগুলো সংগ্রহ করে রাখলে সময় ও খরচ—দুটিই বাঁচে।

দেয়ালে অস্থায়ী ও পরিবর্তনযোগ্য সাজ

ভাড়া বাসায় স্থায়ী পরিবর্তনের বদলে এমন জিনিস ব্যবহার করুন, যা প্রয়োজন হলে খুলে ফেলা যায়। রান্নাঘরের দেয়ালে ড্রিল ছাড়াই লাগানো যায় এমন স্টিক-অন টাইলস, বাথরুমে সহজে সরানো যায় এমন স্টোরেজ কিংবা দেয়ালে ছিদ্র না করেই লাগানো পর্দা এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে।

ছবি, পোস্টার বা শিল্পকর্ম দিয়েও ঘরের চেহারা বদলে দেয়া যায়। পুরোনো বইয়ের প্রচ্ছদ, প্রদর্শনীর পোস্টার, নিজের আঁকা ছবি কিংবা সাদামাটা আলোকচিত্র ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে লাগাতে পারেন। পেরেকের বদলে খুলে ফেলা যায় এমন আঠালো স্ট্রিপ ব্যবহার করলে দেয়ালেরও ক্ষতি কম হবে।

বই ও শোপিসের শৈল্পিক ছোঁয়া

ঘরকে নিজস্ব ক্যানভাস করে তুলতে বই ও স্মারক উপহার বা শোপিসের চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। কম খরচে ঘরকে নান্দনিক ও আলিশান লুক দেয়ার দারুণ এক অনুষঙ্গ হতে পারে বই। দেয়াল ড্রিল না করেই মাটিতে বসানো ছোট ফোল্ডিং বুকশেলফ বা ওপেন র‍্যাকে সারি বেঁধে বই সাজিয়ে রাখতে পারেন। আর বুকশেলফ না থাকলেও চিন্তার কিছু নেই—ঘরের কোনো কোণে বা সাইড টেবিলে ৫-৬টি মোটা বই সুন্দর করে একটার ওপর আরেকটা স্তূপ করে রেখে তার ওপর একটি ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট বা সুগন্ধি মোমবাতি বসিয়ে দিন, নিমিষেই ঘরটিতে একটি ‘ক্যাজুয়াল আর্টি’ লুক চলে আসবে। পাশাপাশি ভ্রমণ থেকে জমানো স্মারক, পুরোনো পোরসেলিনের পাত্র বা পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত শোপিসগুলো বইয়ের মাঝে মাঝে সাজিয়ে রাখলে তা ঘরের পরিবেশকে আরো ব্যক্তিগত ও নিজস্ব করে তোলে। বাসা বদলানোর সময় এসব জিনিস খুব সহজেই বাক্সে ভরে সাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ইনডোর প্ল্যান্টসে ঘরের প্রাণ সঞ্চার

ইট-পাথরের ঘরে তাজা আমেজ আনতে টবজাতীয় গাছের কোনো বিকল্প নেই। লিভিং রুমের কোণে মানিপ্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট, পিস লিলি বা জ্যামিওকুলকাসের মতো কম পরিচর্যার ইনডোর প্ল্যান্টস রাখতে পারেন। এগুলো ঘরে প্রাকৃতিকভাবে অক্সিজেন বাড়ানোর পাশাপাশি এয়ার পিউরিফায়ার হিসেবে কাজ করে। রঙিন সিরামিক বা পাটের বুটিদার বাস্কেটে গাছ রাখলে তা আসবাবের সাথে দারুণ মানিয়ে যায়।

ছোট্ট বারান্দায় প্রকৃতির স্পর্শ ও সুকোমল কোণ

ভাড়া বাসার ছোট বারান্দাটিকেই বানিয়ে ফেলতে পারেন মন সতেজ করার সেরা জায়গা। রেলিংয়ে ঝোলানো যায় এমন মেটালের স্ট্যান্ড বা হ্যাঙ্গিং পটে বারান্দায় লাগাতে পারেন নানা রঙের পর্তুলিকা, নয়নতারা বা ক্যাকটাস। এক কোণে একটি ছোট বাঁশ বা কাঠের র‍্যাক বসিয়ে কয়েক স্তরে ছোট ছোট টব সাজিয়ে নিন। পায়ের নিচে কৃত্রিম ঘাসের ম্যাট বিছিয়ে এবং দুটি মোড়া বা ফোল্ডিং চেয়ারের সাথে ছোট টি-টেবিল রাখলেই তৈরি হয়ে যাবে দারুণ এক ‘‌কফি কর্নার’।

আলো বদলালে ঘরও বদলায়

ঘরের আবহ বদলে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো আলো। শুধু ছাদের উজ্জ্বল সাদা বাতির ওপর নির্ভর না করে ঘরের একাধিক জায়গায় ছোট টেবিল ল্যাম্প, ফ্লোর ল্যাম্প বা ব্যাটারিচালিত আলো ব্যবহার করা যায়।

উষ্ণ টোনের আলো ঘরকে তুলনামূলক আরামদায়ক করে তুলতে পারে। এর সঙ্গে পর্দা, কুশন, চাদর বা ছোট কম্বল যোগ করলে ঘরে আরো স্বস্তির আবহ তৈরি হবে। এসব জিনিসের রং বা নকশা পরিবর্তন করেও ঘরের চেহারা বদলে ফেলা যায়।

সবকিছু একরকম না হলেও চলে

ভাড়া বাসা বলে সব আসবাব একই ধরনের হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। বরং পুরোনো বা ভিন্ন ধরনের একটি চেয়ার, আয়না, ছোট টেবিল কিংবা শোপিস ঘরে আলাদা চরিত্র এনে দিতে পারে।

পুরোনো জিনিসের দোকান, অনলাইন মার্কেটপ্লেস কিংবা পরিবারের অব্যবহৃত জিনিসের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এমন কিছু, যা নতুন করে কাজে লাগানো যায়। বই, ছবি, ঘরের গাছ কিংবা পছন্দের ছোটখাটো জিনিসও ঘরকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলতে পারে।

ঘরের আবহে গন্ধেরও ভূমিকা আছে

ঘর সুন্দর দেখানোর পাশাপাশি সেখানে কেমন অনুভূতি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। হালকা সুগন্ধি মোমবাতি, ডিফিউজার বা রুম ফ্রেশনার ঘরের পরিবেশে ভিন্ন আবহ আনতে পারে। চন্দন বা কাঠের মতো উষ্ণ ঘ্রাণ কিংবা দারুচিনি-এলাচের মতো মসলার সুবাস অনেকের কাছে ঘরকে আরো আরামদায়ক মনে করাতে পারে।

এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের ব্যবহারও ঘরে উষ্ণতা আনে। কুশন, কম্বল, চাদর বা মোটা বুননের কাপড়ের ছোটখাটো সংযোজনেই বদলে যেতে পারে ঘরের অনুভূতি।

সব মিলিয়ে ভাড়া বাসাকে নিজের মতো করে তুলতে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করার প্রয়োজন নেই। বরং এমন কিছু পরিবর্তন বেছে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, যা দেখতে সুন্দর, ব্যবহারিক এবং বাসা ছাড়ার সময় সহজেই খুলে নেয়া যায়। শেষ পর্যন্ত নিজের ঘর মানে শুধু নিজের মালিকানার জায়গা নয়—যে জায়গায় ফিরে এসে স্বস্তি পাওয়া যায়, সেটিই তো আসল নিজের ঠিকানা।

আরও