সকাল ১০টা। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষক দেখলেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী কথা বলছে। তিনি থামতে বললেন। কেউ শুনল, কেউ শুনল না। এক শিক্ষার্থী তর্কে জড়াল। শিক্ষক শাসন করলেন। দিনের শেষে সে ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপর শুরু হলো বিচার—কে ঠিক, কে ভুল, কে কাকে কী বলেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই শিক্ষক হয়ে গেলেন অভিযুক্ত। প্রকাশ্যে তাকে অপমান করা হলো, এক সময় মারধরের ঘটনাও ঘটল। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো ঘটনারই একটি কাল্পনিক চিত্রায়ন এটি।
একের পর এক শিক্ষককে হেনস্তা, মারধর ও অপমানের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে এনেছে, ‘আমরা কি সত্যিই শিক্ষককে সম্মান করি?’
শিক্ষককে তো বলি ‘জাতি গড়ার কারিগর’। জাতীয় দিবসে তাদের অবদান স্মরণ করি। বক্তৃতায় বলি, শিক্ষকরাই তৈরি করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কিন্তু আমাদের বাস্তব আচরণে সে শিক্ষকেরই সামাজিক মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একজন শিক্ষক ভুল করতে পারেন। তিনি অপরাধও করতে পারেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে, প্রমাণ মিললে শাস্তি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অভিযোগের বিচার আর শিক্ষককে অপমান করার ‘অধিকার’ দুটি তো এক বিষয় নয়।
চট্টগ্রামে প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ, ঢাকার তেজগাঁও কলেজে নকল ধরায় শিক্ষককে মারধরের ঘটনা, নরসিংদীতে প্রাইভেট পড়াতে রাজি না হওয়ায় শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এগুলোর ভেতর একটি অভিন্ন সংকেত রয়েছে। শিক্ষক আর শ্রেণিকক্ষের নিরাপদ কর্তৃত্বের জায়গায় নেই। কখনো তিনি অভিভাবকের চাপের মুখে, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীর, কখনো শিক্ষার্থীর, কখনো আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক বিচারের মুখোমুখি। প্রশ্ন হলো, এ পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীকে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ শেখাবেন?
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় শিক্ষকতার মর্যাদা শুধু কথার বিষয় নয়; শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই তার প্রতিফলন আছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডির সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ফিনল্যান্ডের ৪৮ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন সমাজে শিক্ষকরা মূল্যায়িত হন। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোয় এর গড় যেখানে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ ফিনল্যান্ডে প্রতি দুই শিক্ষকের প্রায় একজন মনে করেন সমাজ তাদের পেশাকে যথাযথ মূল্য দেয়।
যেন মহান পেশার মানুষের সংসার নেই। নিজের বিশ্রাম, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নেই। আবার কোনো প্রতিবাদ করলে বলা হয়, ‘শিক্ষকের মুখে এসব মানায় না
ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে বহু আলোচনা হয়। কিন্তু এর কেন্দ্রে শুধু ভালো পাঠ্যক্রম কিংবা আধুনিক স্কুল-ই নেই। আছে শিক্ষক বাছাই, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক আস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি।
শিক্ষককে সেখানে শুধু বই পড়ানোর কর্মী হিসেবে দেখা হয় না। তাকে একজন প্রশিক্ষিত পেশাজীবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শ্রেণিকক্ষে কীভাবে শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি পূরণ করবেন, কোন পদ্ধতিতে পড়াবেন, কীভাবে মূল্যায়ন করবেন—এসব বিষয়ে আস্থা রাখা হয় তার পেশাগত দক্ষতার ওপর।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা বেশ শক্তিশালী। জাপান, সিঙ্গাপুর, কানাডা কিংবা ইউরোপের অনেক দেশে শিক্ষক হওয়ার জন্য দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন এবং নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
এখানে বেতনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ওইসিডির বার্ষিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ‘এডুকেশন অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৫’ বলছে, ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষকদের গড় বার্ষিক বেতন প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫৫ হাজার ৭২৫ ডলার এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৬৩ হাজার ৯২৫ ডলার। অবশ্য শুধু বেতন দিয়ে শিক্ষকতার মর্যাদা তৈরি হয় না। বরং বেতন, কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক সহায়তা এবং সামাজিক সম্মান—সবকিছু মিলে একজন শিক্ষক নিজের পেশাকে কতটা মর্যাদাপূর্ণ মনে করবেন, সেটি নির্ধারিত হয়।
আমাদের সংকট এখানেই। এদেশে শিক্ষককে নিয়ে একটি অদ্ভুত সামাজিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাকে খুব ভালো হতে হবে, আদর্শবান হতে হবে, ত্যাগী হতে হবে, ধৈর্যশীল হতে হবে। কিন্তু তার নিজের জীবনযাত্রার মান কেমন, কর্মপরিবেশ কেমন, সামাজিক নিরাপত্তা কতটা—এসব প্রশ্ন খুব একটা সামনে আসে না। বেতন বাড়ানোর দাবি করলে বলা হয়, ‘শিক্ষকতা তো মহান পেশা।’
যেন মহান পেশার মানুষের সংসার নেই। নিজের বিশ্রাম, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নেই। আবার কোনো প্রতিবাদ করলে বলা হয়, ‘শিক্ষকের মুখে এসব মানায় না!’
একজন শিক্ষক আজ যে শিশুটিকে পড়াচ্ছেন, সে হয়তো ২০ বছর পর চিকিৎসক হবে। কেউ হবে প্রকৌশলী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ বিচারক, কেউ সাংবাদিক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ আবার শিক্ষকই হবে। অর্থাৎ শিক্ষক বর্তমানের সঙ্গে কাজ করলেও তার আসল কাজ ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ কারণে শিক্ষকতার সংকটকে শুধু শিক্ষা খাতের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই
আসলে একটি পেশাকে যত বেশি নৈতিকতার মোড়কে ঢেকে ফেলা হয়, তার বাস্তব সমস্যাগুলো তত বেশি অদৃশ্য হয়ে যায়। এখানে একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার করা জরুরি। শিক্ষককে সম্মান করার কথা বলার এ অর্থ নয়, যে তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে। বরং একজন শিক্ষককে যত বেশি মর্যাদা দেয়া হবে, তাকে তত বেশি পেশাগত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করেন, যৌন হয়রানি করেন, ঘুষ নেন, পরীক্ষায় অনিয়ম করেন, কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেন কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু সেই ব্যবস্থা হবে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক। ‘জনতা’র হাতে নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক রায়ে নয়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবে নয়।
অভিযোগ উঠলেই আমরা তদন্তের অপেক্ষা করতে চাই না। ভিডিও ভাইরাল হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য শুরু হলো, এরপর শুরু হলো শাস্তির দাবি। কিন্তু কোনো শিক্ষককে অপমান করার আগে আমরা কি ভাবি—এ মানুষটিই হয়তো আমাদের সন্তানকে আগামীকাল ক্লাস নেবেন?
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষককে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা এই সংকটকে আরো দৃশ্যমান করেছে। যে শিক্ষক পরীক্ষার হলে নকল ধরবেন, তিনি যদি মারধরের ভয় পান, তাহলে পরেরবার নকল দেখেও হয়তো চুপ থাকবেন। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শৃঙ্খলা শেখাবেন, তিনি যদি অভিভাবকের প্রতিশোধের ভয় পান, তাহলে হয়তো প্রয়োজনীয় কঠোরতাটুকুও দেখাবেন না। যে প্রধান শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানাতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীর রোষানলে পড়বেন, তিনি হয়তো পরবর্তী সময়ে নিয়ম প্রয়োগের আগেই ভাববেন—‘আমার নিরাপত্তা কোথায়?’ আর এভাবেই কিন্তু শিক্ষকতার কর্তৃত্ব ক্ষয়ে যায়।
একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা। শিক্ষার্থী শিক্ষককে প্রশ্ন করবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে স্বাগত জানাবেন। অভিভাবক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলবেন। শিক্ষকও অভিভাবকের উদ্বেগ শুনবেন। কোথাও অভিযোগ থাকলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তদন্ত হবে। এ সম্পর্কের জায়গায় যদি ভয় ঢুকে পড়ে, তাহলে শিক্ষা থাকে না; থাকে শুধু আনুগত্য।
আমাদের বিদ্যালয়গুলোয় তাই শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্কের জন্য সুস্পষ্ট আচরণবিধি দরকার। শিক্ষককে যেমন শিক্ষার্থীর প্রতি আচরণের সীমা জানতে হবে, তেমনি অভিভাবককেও জানতে হবে শিক্ষককে হুমকি দেয়া, অপমান করা কিংবা শারীরিকভাবে আক্রমণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একজন শিক্ষক আজ যে শিশুটিকে পড়াচ্ছেন, সে হয়তো ২০ বছর পর চিকিৎসক হবে। কেউ হবে প্রকৌশলী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ বিচারক, কেউ সাংবাদিক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ আবার শিক্ষকই হবে। অর্থাৎ শিক্ষক বর্তমানের সঙ্গে কাজ করলেও তার আসল কাজ ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ কারণে শিক্ষকতার সংকটকে শুধু শিক্ষা খাতের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
শিক্ষকতা যদি কম বেতন, বেশি চাপ, কম স্বাধীনতা এবং বেশি অপমানের পেশা হয়ে ওঠে, তাহলে সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা অন্য পেশা বেছে নেবেন। আর এর ফল একদিন শ্রেণিকক্ষে দেখা যাবে। তখন হয়তো আমাদের স্কুলে ভবন থাকবে, স্মার্ট বোর্ড থাকবে, ডিজিটাল কনটেন্ট থাকবে, নতুন পাঠ্যবই থাকবে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে এমন শিক্ষক থাকবেন না, যিনি একজন শিশুর চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারেন।