বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির দ্রুত অবনতির শিকার হতে পারেন দীর্ঘমেয়াদে ঘুমহীন রাত পার করা বা অনিদ্রায় ভোগা মানুষেরা। এমনকি তাদের মস্তিষ্কে এমন পরিবর্তনও আসতে পারে যা ইমেজিং স্ক্যানে ধরা পড়া সম্ভব। আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজির চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নিউরোলজিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তোলে দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রা। খবর সায়েন্স ডেইলি।
এতে দেখা যায়, অন্তত তিন মাস ধরে সপ্তাহে তিন দিন বা তার বেশি সময় ধরে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয়, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ঘুমের সমস্যা না থাকা ব্যক্তিদের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে নিদ্রাহীন রাত পার করা ব্যক্তিদের মস্তিষ্ক স্বাভাবিক বয়সের তুলনায় গড়ে সাড়ে ৩ বছর বেশি বুড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। তবে গবেষণা প্রতিবেদনে মস্তিষ্ক বুড়িয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে সরাসরি অনিদ্রাকে দায়ী করে কোনো প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি। বরং বিষয়দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা গেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রচেস্টারভিত্তিক মায়ো ক্লিনিকের চিকিৎসক এবং আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজির সদস্য দিয়েগো জেড কারভালহো। তিনি বলেন, ‘রাতের অনিদ্রা শুধু পরের দিনটিকে প্রভাবিত করে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। চিন্তাশক্তির দ্রুত অবনতি ও মস্তিষ্কে পরিবর্তন থেকে আমরা ইঙ্গিত পাচ্ছি যে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রাকে স্মৃতিভ্রংশের প্রাথমিক লক্ষণ বা এমনকি এর সহায়ক হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।’
২ হাজার ৭৫০ জন প্রবীণের (যাদের গড় বয়স ৭০ বছর) গড়ে সাড়ে ৫ বছরের তথ্য সংকলনের মাধ্যমে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। পর্যবেক্ষণ কালের শুরুতে তাদের সবারই স্মৃতিশক্তি ছিল স্বাভাবিক। তাদের মধ্যে ১৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রায় ভুগছিলেন।
গবেষণা শুরুর সময় পরিচালিত এক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, আগের দুই সপ্তাহে তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নাকি কম ঘুমিয়েছেন। প্রতি বছর তাদের চিন্তা ও স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা নেয়া হয়। আর কয়েকজনের মস্তিষ্কে ‘হোয়াইট ম্যাটার হাইপারইনটেনসিটি’ (যেখানে ছোট রক্তনালির রোগ মস্তিষ্কের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে) এবং অ্যামাইলয়েড প্লাকের (এক ধরনের প্রোটিন, যা আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত) উপস্থিতি শনাক্তে স্ক্যান করা হয়।
গবেষণার সময়ে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রায় ভোগা ১৪ শতাংশ মানুষ স্মৃতিভ্রংশের আক্রান্ত হন, যেখানে অনিদ্রাহীনদের মধ্যে এ হার ছিল ১০ শতাংশ। বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের ওষুধ সেবন ও স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো বিষয়গুলো হিসাবের মধ্যে নেয়ার পরও দেখা যায়, অনিদ্রায় আক্রান্তরা অন্যদের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। চিন্তাশক্তির পরীক্ষায়ও তাদের দ্রুত অবনতি ধরা পড়ে।
দিয়েগো জেড কারভালহো বলেন, ‘আমাদের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অনিদ্রা মস্তিষ্ককে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যেখানে শুধু অ্যামাইলয়েড প্লাক নয়, বরং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ছোট রক্তনালিও জড়িত থাকতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে শুধু ঘুমের মানোন্নয়ন নয়, বরং বয়স্ক অবস্থায় মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার চিকিৎসা করা জরুরি। এটি আবারো মনে করিয়ে দেয় যে ঘুম শুধু বিশ্রামের বিষয় নয়; এটি মস্তিষ্কের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।’
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ, জিএইচআর ফাউন্ডেশন, মায়ো ফাউন্ডেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন এবং কিছু অনুদানের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।