বই নিয়ে কিছু মানুষ নিরন্তর কথা বলে যায়। তবে বলার ধরণটা সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। একটা সময় ম্যাগাজিনে, ছোট কাগজে, পাঠচক্রে বলা হতো, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়। কিছুদিন আগেও ফেসবুকে নানা গ্রুপে বই নিয়ে আলাপ হতো। ইনস্টাগ্রাম জনপ্রিয় হওয়ার পর তৈরি হয় 'বুকস্টাগ্রাম' ও ‘বুকস্টাগ্রামার’। পাশাপাশি মানুষ ভিজ্যুয়ালে অভ্যস্ত হওয়ার পর সামনে আসে বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। তারা বইয়ের ছবি তোলেন, ভিডিও রিভিউ করেন, বই নিয়ে নানা কনটেন্ট তৈরি করেন। পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের কাছেও বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় তারা। তবে ২০২৬ বইমেলায় আর সব কিছুর মতো বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও ম্রিয়মান। কেননা এবারের বইমেলা প্রতিবারের মতো জমজমাট না।
সাধারণত প্রতিবছর বইমেলায় প্রচুর পরিমাণ বই প্রকাশ পায় এবং সেসব বইয়ের প্রচারে যুক্ত থাকেন বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। কিন্তু এ বছর অনিশ্চিত হয়ে থাকা বইমেলায় বইয়ের সংখ্যা কম। সব লেখক-প্রকাশক বইয়ের প্রচারের ক্ষেত্রে আধুনিকমনষ্কও নন। দেখা যাচ্ছে, লেখক-প্রকাশকদের সঙ্গে যে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা কাজ করেন, সেসব প্রকাশনার বইয়ের সংখ্যাও কম। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, এতসবের মধ্যে কেমন যাচ্ছে বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মেলা ও দিনকাল?
বই নিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন মুসাইয়্যিব বিন মুজিব। 'মুসার বইযাত্রা' তার এ বিষয়ক ফেসবুক পেজ। সেইসঙ্গে কনটেন্ট তৈরি করেন ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামেও। প্রতি বছরের মেলার হালচালের সঙ্গে এবারের পার্থক্য নিয়ে স্বভাবসুলভ ক্যাজুয়াল ভাষায় তিনি বলেন, ‘সবকিছুই কমের ওপর দিয়ে পার করতে দেখা যাচ্ছে; বই, আমেজ, অংশগ্রহণ সবই কম।’
বই ও মুসাইয়্যিব বিন মুজিব। ছবি: মুসার বইযাত্রা
'আইডেমহলিক' নামে কনটেন্ট তৈরি করেন যোবায়ের রহমান। তিনি বলেন, ‘অন্য সময়ের মেলার সঙ্গে পার্থক্য হলো এ মেলাতে প্রাণ নাই; যেটা আগের মেলাতেও ছিল! ৫-১০ তারিখের পর প্রতিদিনই দেখা যেত, পরিচিত কারো না কারো বই আসছে। এবার এটার ছিটে-ফোঁটাও নাই। আগে আভাস পেতাম কোন বই আসছে, এবার তাও পাচ্ছি না।’
বই নিয়ে কনটেন্ট করে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন লিংকন হাসান। বাংলাবাজারে নিয়মিত যাতায়াত তার। মেলার মাঠের আমাজের পাশাপাশি প্রকাশকদের কাজ, বইয়ের প্রডাকশনের সঙ্গেও পরিচিত তিনি। সব নিয়ে লিংকন বলেন, ‘প্রতিবছর মেলার প্রস্তুতির একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেটা বিভিন্ন ধাপের জন্য রক্ষিত লিড টাইমের ওপর নির্ভর করে। যেমন, পান্ডুলিপি জমা দেয়ার তারিখ, সম্পাদনার জন্য বেঁধে দেয়া সময়, প্রেসে এবং এরপর বাঁধাইখানায় পাঠানোর দিনক্ষণ, এসব আর কি। এবারে এ পদ্ধতির প্রায় পুরোটাই ব্যাহত হয়েছে। আর সৃজনশীল কাজের জন্য একাগ্রতা, সময়, নিশ্চয়তা—এ তিনটা জিনিসেরই খুব প্রয়োজন। এ বছর বইমেলার প্রারম্ভে এগুলোর একটাও ছিল না।’
বই, বাগানবিলাস ও লিংকন হাসান। ছবি: লিংকন হাসানের ফেসবুক
মোটামুটি কভিড-১৯ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশে বুক কনটেন্ট তৈরিতে জোয়ার আসে। মুসাইয়্যিব বিন মুজিব, লিংকন হাসান, যোবায়ের রহমানের পাশাপাশি অথৈ দাস, সায়মা তাহের শোভন, ভাবনা মুখার্জি, বুকস উইথ নাহিয়ান, রমজান আলী ইমন ও তার বইবৃক্ষ, মাসুম আহমেদ আদি, সূচনা অলওয়েস, মালিহা নবনীসহ আরো অনেকে সরব বই নিয়ে। বুক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার বিশ্বের অনেক দেশেই জনপ্রিয়। বিদেশে রীতিমতো পেশাদারভাবে তারা কাজ করেন। প্রকাশকরাও পেশাদারভাবেই তাদের নিযুক্ত করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ বাজার পুরোপুরি কাঠামোবদ্ধভাবে তৈরি হয়নি।
মালিহা নবনী এক সময় নিজে বইয়ের কনটেন্ট তৈরি করেছেন, আবার কখনো দলগতভাবেও কাজ করেছেন। বুক কনটেন্ট তৈরি ও এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ২০২৬ সালে এসে বাজারটা আসলে খুব একটা ভালো না। ২০২১-২২ সালে কনটেন্ট তৈরির একটা জোয়ার ছিল, এখন সেটা নেই। সুযোগ আছে এখনো, তবে এ বছর মেলার সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে বিশেষ করে কনটেন্ট তৈরির ব্যপারটায় ভাটা পড়েছে।’
বইমেলায় মালিহা নবনী। ছবি: নবনীর ফেসবুক
লিংকন হাসান বলেন, ‘বুক কন্টেন্টের প্রতিষ্ঠিত কোনো বাজার নেই আসলে। যারা করেন, তারা স্রেফ হয়তোবা শখের বশেই শুরু করেন। দর্শকের সংখ্যা বাড়লে তখন কিছু প্রকাশনী তাদের বইয়ের প্রচারণার জন্য যোগাযোগ করেন। পেইড কোলাবরেশনের সুযোগ এর মধ্যে অধিকাংশের নসীবেই জোটে না। এর মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের বই ইন্ডাস্ট্রি এখনো পুরনো ধারার প্রচারণায় বিশ্বাসী। আবার তার মধ্যে অধিকাংশ প্রকাশনী কোনো প্রচারণাই চালায় না বলতে গেলে।’
নবনী বলেন, ‘পেইড রিভিউকে অনেকে চক্ষুশূল হিসেবে দেখে। কিন্তু সত্যি বলতে, পেইড রিভিউও সব সময় যে একপাক্ষিক হয়, বিষয়টা এমন না। তো এখানে পেইড ও আনপেইড রিভিউ, কনটেন্ট নিয়ে এখনো একটা কমপ্লেক্স দৃষ্টিকোণ আছে। তাছাড়া সত্যি বলতে আমাদের লেখক-প্রকাশকরা এখনো কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও পেইড মার্কেটিংয়ের সঙ্গে এখনো পুরোপুরি যুক্ত করতে পারেননি।’
এ বিষয়ে মুসা বলেন, ‘বইয়ের প্রচারণায় বই নিয়ে সরব পরিচিত মুখদের ‘হায়ার’ করা যায়, ধারণাটা এখনো গ্রহণ করতে পারেনি বেশিরভাগ প্রকাশক। ‘বাজার’ যদি বলতে হয়, তা ২০২৪-২৫ সাল থেকে গড়ে উঠছে এবং বলতেই হবে, প্রমোশনাল কন্টেন্ট বানানোর ব্যয় আর ক্লায়েন্টদের খরচ করার ইচ্ছার মাঝে ব্যবধান অনেক।’
এ প্রসঙ্গে অবশ্য যোবায়ের একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে খরচের পরিমাণও প্রকাশক ও লেখকদের মধ্যে অনীহা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘কনটেন্ট মেকিংয়ের বাজার এমনিতেই ছোট। এর মধ্যে বিগত সময়ে কয়েকজন বিখ্যাত-অখ্যাত কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাদের কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নেয়া ও কাজের স্বচ্ছতা না রাখার কারণে প্রকাশক ও লেখকরা এগিয়ে আসছেন না।’
যোবায়ের রহমান ও বইপত্র। ছবি: যোবায়েরের ফেসবুক
মুসা ও নবনী অনেকদিন থেকেই বুক কনটেন্ট তৈরি করে আসছেন। তারা জানাচ্ছেন, এখনো প্রকাশক ও লেখকের সঙ্গে প্রচারণা বিষয়ে আলাপ করে তারা একটা পরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে কাঠামোবদ্ধ কোনো সমাধান বা কর্মপরিকল্পনায় যেতে পারেন না। গত দুই বছর রমজান আলী ইমন ও বইবৃক্ষ পেশাদারভাবে কাজ করেছিল বুক কনটেন্ট নিয়ে। তবে বইমেলায় তারা একেবারেই নীরব।
একটা সময় বইমেলায় ঘুরে ঘুরে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করতেন মুহম্মদ আহসান নাহিয়ান। তিনি সারা বছরই বই নিয়ে কথা বলেন। কনটেন্ট তৈরি করেন। এ চর্চাকে তিনি ভেতর থেকে দেখছেন বহুদিন ধরে। বুক কনটেন্টের বাজার নিয়ে তিনি রীতিমতো একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নাহিয়ান বলেন, ‘বাজার হিসেবে বলতে গেলে তো আসলে অনেক কথাই চলে আসবে। বাজারে অনেক পক্ষ থাকে। সেক্ষেত্রে বুক কনটেন্টের কোনো বাজার না হওয়ার দায় সব পক্ষের ওপরই বর্তায়। আগে ভাবুন বইয়ের বাজারের কী অবস্থা, সেই বাজার ভালো না হলে বইয়ের কন্টেন্ট তৈরির বাজার ভালো হবে কী করে? বিক্রেতা বা প্রকাশকেরা অনেক ক্ষেত্রেই হয় বই সম্পর্কে ভালো জানেন না, নয়তো মার্কেটিং সম্পর্কে ভালো বোঝেন না। মার্কেটিংয়ের সঙ্গে রেভিনিউ জেনারেশনের যে সমানুপাতিক সম্পর্ক, সেটার প্রয়োগ আমরা এ জগতে দেখি না। আর দেখি না বলেই হয়তো বেহাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ বেহাল দশা।’
চা, বই ও নাহিয়ান। ছবি: মুহম্মদ আহসান নাহিয়ানের ফেসবুক
পাশাপাশি প্রশ্ন আসে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও লেখক-প্রকাশক পক্ষের পেশাদারত্বের। এ নিয়ে সায়মা তাহের শোভন বলেন, ‘বর্তমানে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই জানেন একটা ভালো রিভিউ, রিল বা ফটোশ্যুট বইকে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। তাই তারা বই পাঠান, ব্রিফ দেন, কখনো পারিশ্রমিকও অফার করেন। তবে এখনো অনেক ক্ষেত্রে একটা ভুল ধারণা থাকে, যেহেতু ক্রিয়েটর বই ভালোবাসেন, তাই তার কাজটাও 'শখের'। ফলে কনটেন্টের সময়, শ্রম, ক্রিয়েটিভিটির যথাযথ মূল্যায়ন সবসময় হয় না। আবার অনেকে শুধু ভালোটাই শুনতে চান, যা একেবারেই কাম্য না।’
বই নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করতে গিয়ে অনেক রকম অভিজ্ঞতাই হয়েছে সায়মার। তিনি বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক প্রকাশক/প্রকাশনী থেকে বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বই পাঠানোর সঙ্গে এটাও ভেবে রাখেন, বইটা তার পছন্দ হবেই; যেহেতু তাদের সময় ও শ্রম এর মাঝে আছে এবং বিষয়টি নিয়ে পরে মানে পড়ার পরে কথা হলে একধরনের বেখাপ্পা পরিবেশের সৃষ্টি হয়ে যায়। তবে এ ব্যাপারে আমি আগে থেকেই বেশ কিছু জিনিস পরিষ্কারভাবে আলোচনা করে নেই, যাতে পরে কোনো সমস্যা না হয়, বিশেষ করে যখন পারিশ্রমিকের বিষয় থাকে।’
বই পড়ছেন সায়মা তাহের শোভন। ছবি: সায়মা তাহের শোভন
পেশাদারত্বর অভাবই বাজার তৈরিতে বড় বাধা। বই বিক্রি খুব কঠিন হওয়ার কথা না কিন্তু হয়ে যাচ্ছে নাহিয়ান বলেন, ‘২০ কোটি মানুষের দেশে ৩০০ কপি বই বিক্রি করতে হিমশিম খান অধিকাংশ প্রকাশক। অথচ ব্যাপারটা নিশের কাছে পৌঁছানোর ব্যর্থতা ছাড়া কিছু না। অন্যদিকে শখের বসে বইয়ের কন্টেন্ট ক্রিয়েট করেন এমন অনেকের নেই প্রোফেশনালিজম। ফলে না বুঝে ইনভেস্ট করে অনেক প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হন। কন্টেন্ট, মার্কেটিং বা সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে ধারণা না থাকায় সহজেই ঠকে যান। নিশ-এর ব্যাপারটাকে অনেকে মিলিয়ে ফেলেন কেবল রিচ-এর নাম্বারের সঙ্গে। সব মিলিয়ে এক্সপেক্টেশনের সঙ্গে আউটকাম মেলেনা। তাই এ ব্যাপারে প্রকাশকদের কম ধারণা, বুক ইন্ডাস্ট্রিতে মার্কেটিয়ারের অভাব এবং প্রোফেশনালিজম মেন্টেইন করা মানসম্পন্ন বুক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের অপ্রতুলতাই বাজার তৈরি না হবার মুখ্য কারণ।’