ঘটনাটি বিগত ৬ ডিসেম্বরের। জাপানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী তখন বিকাল ৪টা (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা)। ওকিনাওয়ার কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিমানবাহী রণতরী লিয়াওনিং থেকে উড্ডয়ন করে এক চীনা জে-১৫ ফাইটার জেট। কাছাকাছি অবস্থানরত একটি জাপানি একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে মিসাইল রাডারে লক করে ফেলেন চীনা ফাইটার জেটের পাইলট। বিষয়টিকে আসন্ন হামলার ইঙ্গিতবাহী বিবেচনায় প্রতিক্রিয়ায় আরো কয়েকটি যুদ্ধবিমানকে আকাশে তোলে জাপান। যদিও শেষ পর্যন্ত সংঘাত বাধেনি। তবে ওইদিন এমন ঘটনা দুইবার ঘটেছে বলে দাবি করছে জাপান সরকার।
দুই দেশের যুদ্ধবিমানের পাইলটরা যখন প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক একই সময় এক অনলাইন আলোচনায় চীনের মূল ভূখণ্ডে নিজেদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছিলেন জাপানের তরুণরা। নভেম্বরের শুরুতে তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির করা এক মন্তব্যের জেরে দুই দেশের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উঠে আসে ওই অনলাইন আয়োজনে।
জাপান–চীন যুব ফোরামটি আয়োজন করে টোকিওভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা দুয়ান প্রেস। কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের আয়োজন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বার্ষিক এ আয়োজনে অংশ নেয় জাপানি ভাষায় দুটি রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীরা। দুটি প্রতিযোগিতার একটি আয়োজন করা হয় মূল ভূখণ্ডের চীনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য। আরেকটি চীনে সময় কাটানো জাপানি নাগরিকদের জন্য। এ বছর অনুষ্ঠানটির আয়োজন হয়েছে অনলাইনে। তবে আয়োজক ও কয়েকজন অংশগ্রহণকারী টোকিওতে একত্রিত হয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে এক জাপানি নারী চীনের নিংবোতে কাটানো সময়ের সুখস্মৃতি ও সেখানকার স্থানীয়দের সঙ্গে গড়ে ওঠা দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরেন। ঠিক ওই মুহূর্তটিতেই চীনা জে-১৫ এর বৈমানিক জাপানি এফ-১৫-কে রাডারে লক করেন। একই সময় চলমান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা অভিমত দেন যে ভূরাজনীতির পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেনো, দুই দেশের মধ্যে নাগরিক পর্যায়ের বিনিময় চালু রাখতেই হবে।
ফোরামের আয়োজকরা রচনা প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। এবার চীনা শিক্ষার্থীদের রচনার বিষয় ছিল ‘ওশিকাতসু থেকে জন্ম নেয়া নতুন জাপান–চীন বিনিময়’। ‘ওশিকাতসু’ একটি তুলনামূলক নতুন জাপানি শব্দ। এর অর্থ হলো প্রিয় আইডল বা সেলিব্রিটিকে সমর্থন জানানো ভক্তের কার্যক্রম।
তবে সম্প্রীতির বাণী থাকলেও এ অনুষ্ঠানেও পড়েছে ভূরাজনৈতিক অভিঘাতের ছাপ। প্রতিযোগিতার ছয় বিজয়ীর মধ্যে তিনজন নানা কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়ান। চীনের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনলাইনে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল তাদের।
দুয়ান প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক ডুয়ান ইউয়েজং অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া চীনের মূল ভূখণ্ডের শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতেও এতে অংশ নিয়ে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তারা।’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নভেম্বরের শুরুতে তাইওয়ান নিয়ে করা এক মন্তব্য বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর পর থেকে চীনে জাপানের নাগরিক পর্যায়ের যোগাযোগ এবং বহু সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বিনিময় কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী শুক্রবারেই টোকিওর চীনা দূতাবাসে এমন আরেকটি অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু ‘অনিবার্য কারণবশত’ তা বাতিল করা হয়েছে বলে আয়োজকদের দূতাবাসের সচিবালয় জানিয়েছে।
ওশিকাতসু কার্যক্রমও এ বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। ‘ওয়ান পিস’ সিরিজের থিম সং গাওয়ার জন্য পরিচিত জাপানি অ্যানিমে গায়িকা মাকি ওতসুকিকে ২৮ নভেম্বর সাংহাইয়ে এক পরিবেশনার সময় হঠাৎ মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। গেমস ও বিনোদন প্রতিষ্ঠান বান্দাই নামকো চীনের মূল ভূখণ্ডের ভক্তদের জন্য তিন দিনের উৎসবের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। কিন্তু শেষ দুই দিনের আয়োজন বাতিল করে দেয়া হয়। এখানেও অনিবার্য কারণেই আয়োজনটি বাতিল হয়েছে বলে জানানো হয়।
এর আগে সাংহাইয়ে গত ২৯ নভেম্বর জাপানি পপ ডিভা আয়ুমি হামাসাকির একটি কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। যদিও অনুষ্ঠানের আগে আগে ইনস্টাগ্রামে তিনি জানান, আগের দিন তাকে ও তার দলকে অনুষ্ঠান বাতিলের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ততক্ষণে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টিকিট। শেষ পর্যন্ত ভক্তদের জন্য রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে ফাঁকা ভেন্যুতেই গান গেয়েছেন তিনি।
এছাড়া বেইজিং নিয়ন্ত্রিত ম্যাকাওয়ে আগামী ১০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় আয়ুকি হামাসাকির আরেকটি কনসার্টও বাতিল করা হয়েছে।
আগামী বড়দিন (২৫ ডিসেম্বর) থেকে হায়াও মিয়াজাকির অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টুডিও ঘিবলির একটি প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় আয়োজকরা জানিয়েছেন, কোনো কারণ দেখিয়েই সেটিও ‘স্থগিত’ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক সংকটে দুই দেশের পরিবহন যোগাযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনের মূল ভূখণ্ডের এয়ারলাইন সংস্থাগুলোর জাপানমুখী বহু সরাসরি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ১৯৮৫ সাল থেকে সাংহাইয়ের সঙ্গে ওসাকা ও কোবে যুক্ত করা যাত্রীবাহী জাহাজ জিয়ান ঝেন হাও (জাপানিতে গান জিন গো) ৬ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে। জাহাজের ওসাকাভিত্তিক অপারেটর প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এটি চলাচল বন্ধের কারণ হিসেবে চীনা পক্ষের নোটিশে বলা হয়েছে, জাপান ও চীনের মধ্যে নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কবে থেকে এটি আবার চালু করা যাবে, তা তারা জানে না।