বিদেশে গেলেই একের পর এক সম্মাননা ও পদক নিয়ে দেশে ফেরেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত ১২ বছরের শাসনামলে তার ঝুলিতে জমা হয়েছে ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এসব পুরস্কার কি আসলেই ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতিফলন, নাকি মোদির ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার এক সুনিপুণ কৌশল?
সম্প্রতি সেশেলস সফরে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ নামের একটি বিশেষ বেসামরিক পুরস্কার লাভ করেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনি মোদির হাতে এ বিশেষ ট্রফি ও প্রশংসাপত্র তুলে দেন। তবে এ পুরস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে অন্য কারণে। কারণ মোদির সফরের ঠিক আগে এটি চালু করা হয়। আর পুরস্কারের সনদে দেশটির নামসহ একাধিক বানান ভুলও ধরা পড়ে।
কূটনৈতিক এ ‘তাড়াহুড়ো’ আরো স্পষ্ট হয় যখন মোদির হাতে তুলে দেয়া প্রশংসাপত্রটির ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে সেশেলসের ইংরেজি বানানে মারাত্মক ভুল চোখে পড়ে। ইংরেজিতে আসল নাম ‘Republic of Seychelles’ হলেও প্রশংসাপত্রের খসড়ায় ভুল বানানে লেখা হয়েছিল ‘Repubblic of Seycheeles’।
এ ঘটনা নিয়ে খোদ ভারতের বিরোধী দলগুলো বেশ পরিহাস শুরু করেছে। কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, বিশ্ব এখন মোদির মানসিকতা বুঝে গেছে। যেকোনো একটি পুরস্কারের ব্যবস্থা করলেই তিনি ছুটে যান।
পরে অবশ্য সেশেলস সরকার ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সনদটি ছিল খসড়া। চূড়ান্ত সনদে ভুলগুলো সংশোধন করা হয়েছে।
গত ১২ বছরে বিদেশ সফরে মোদি ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। সর্বশেষ ইন্দোনেশিয়া তাকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘বিনতাং আদিপূর্ণা’ প্রদান করেছে। এর আগে জুনে স্লোভাকিয়া তাকে ‘অর্ডার অব দ্য হোয়াইট ডাবল ক্রস, ফার্স্ট ক্লাস’ দেয়, যা বিদেশী রাষ্ট্রনায়কদের জন্য সংরক্ষিত দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক। আবার ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল সফরে তিনি পান ‘স্পিকার অব দ্য নেসেট মেডেল’। এ পদকটিও তার সফরের ঠিক আগে চালু করা হয়েছিল।
মোদি এর আগেও জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশ সম্মাননা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের ‘গ্লোবাল গোলকিপার অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ফিলিপ কটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। শেষের পুরস্কারটি প্রতিবছর দেয়ার কথা থাকলেও মোদির পর আর কাউকে দেয়া হয়নি।
প্রতিবারই মোদি দাবি করেন, এসব সম্মাননা ব্যক্তিগত নয়; বরং ভারতের জন্য। অনেকের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় তারা দিল্লিকে গুরুত্ব দিতেই এসব সম্মাননা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পুরস্কারগুলোর অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক কার্যকারিতা খুবই সীমিত। যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক নিতাশা কাউল মনে করেন, এ পুরস্কারগুলো ভারতের কূটনীতির চেয়ে মোদির ব্যক্তিগত প্রচারণাকে বেশি ভারী করে। অনেক দেশ ভারতের মতো বিশাল বাজারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভালো রাখতে বা নয়াদিল্লিকে সন্তুষ্ট করতেই এমন সব নতুন পুরস্কারের জন্ম দেয়।
তবে সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সত্যিকারের ব্যবহারিক সাফল্যের চেয়ে তড়িঘড়ি করে তৈরি করা এ পুরস্কারগুলো বেশিরভাগ সময় স্রেফ হাসির খোরাক জোগায়।