মিত্রতার বিনিময়ে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ: আত্মঘাতী পথে যুক্তরাষ্ট্র

শক্তি দিয়ে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় কেবল বিশ্বাস ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে

বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চল এখন নতুন ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র। পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুয়েজ খালপথের তুলনায় নর্দার্ন সি রুট প্রায় ৫ হাজার মাইল ছোট আর এতে যাত্রা সময়ও প্রায় ১৪ দিন কম। গ্রিনল্যান্ডের বিশাল আয়তন ও কেন্দ্রীয় অবস্থান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কৌশলগত সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে দিতে পারে

ইতিহাসের চাকা অদ্ভুতভাবে ঘোরে। খ্রিস্টপূর্ব ৪১৬ অব্দে এজিয়ান সাগরের নীল জলরাশিতে ঘেরা ছোট্ট দ্বীপ মেলোস যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, দুই সহস্রাব্দ পর উত্তর আটলান্টিকের বরফশীতল গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ঠিক একই ধরনের এক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে।

অ্যাথেন্সের সেই ‘ভুল’ পাঠ

পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধের সময় অ্যাথেন্স ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তি। সামরিক শক্তির পাশাপাশি ছোট ছোট নগররাষ্ট্রের সঙ্গে জোট গড়ে তুলে এথেন্স তখন শক্ত অবস্থানে ছিল। আজকের ন্যাটোর সঙ্গে তুলনীয় ডেলিয়ান লীগ নামের সে জোট প্রায় ৭০ বছর ধরে টিকে ছিল।

সে সময় ভূমধ্যসাগরের ছোট দ্বীপ মেলোসকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করে এথেন্স। দ্বীপটির নিজস্ব সামরিক শক্তি না থাকলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল। মেলোস নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করলেও এথেন্স তা মানতে রাজি হয়নি। বরং নিয়ন্ত্রণের নেয়ার দাবি তুলেছে। বিপরীতে মেলিয়ানরা যখন তাদের সার্বভৌমত্ব আর বন্ধুত্বের প্রশ্ন তুলেছিল অ্যাথেন্স তখন দম্ভভরে বলেছিল:

জগতে ন্যায়বিচার কেবল সমানে-সমানেই সম্ভব; শক্তিশালী যা চায় তা-ই করে, আর দুর্বলকে তা মুখ বুজে সয়ে নিতে হয়।

শেষ পর্যন্ত এথেন্স বলপ্রয়োগে মেলোস দখল করে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তই তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসভিত্তিক জোটগুলোকে দুর্বল করে দেয়। শক্তি দিয়ে মিত্রদের বশে রাখার চেষ্টা শুরু হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। এক দশকের মধ্যেই এথেন্স পরাজিত হয়।

ট্রাম্পের ‘গ্রিনল্যান্ড ভাবনা’

সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ আর তার প্রশাসনের বক্তব্য অনেকটা সেই এথেন্সের যুক্তির মতোই। ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের বক্তব্যে সেই প্রাচীন অ্যাথেনীয় দম্ভের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। মিলারের মতে, আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার বা কূটনৈতিক সৌজন্য নিয়ে যত কথাই বলা হোক, বাস্তব দুনিয়া চলে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার নিয়মে। শক্তির এ আইন আদিকাল থেকেই বিদ্যমান।

এ বক্তব্যে মিলার আংশিকভাবে যথার্থ বলেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শন একটি অপরিহার্য বাস্তবতা, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এটিও সত্য সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক উদ্ভাবনে নেতৃত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র।

তবে ইতিহাস বলে, এ সত্য একসময় এথেন্সের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। তখন যেমন স্পার্টা ছিল এথেন্সের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, আজ তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে চীন। এখানেই মিলারের কথিত ‘শক্তির চিরন্তন আইন’ সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক ক্ষমতা ধরে রাখার মূল সূত্র কেবল বলপ্রয়োগ নয়। বরং পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক জোট, মিত্রতা ও সম্মতির মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র তার প্রভাব ও নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। শক্তি দিয়ে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় কেবল বিশ্বাস ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে।

গ্রিনল্যান্ড কী মেলোসের আধুনিক সংস্করণ?

এথেন্সের জন্য যেমন মেলোস ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা স্বার্থেও গ্রিনল্যান্ড তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। আর এ বিষয়টি অনুধাবন করা প্রথম ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প নন।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ও অ্যান্ড্রু জনসনের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা উইলিয়াম সিউয়ার্ড রাশিয়ার কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে আলাস্কা কেনার চুক্তি করেন। এরপরই গ্রিনল্যান্ডের দিকে নজর পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের। ১৮৬৮ সালের মধ্যে ডেনমার্কের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড কেনা নিয়ে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়। বিনিময়ে প্রায় ৫৫ লাখ ডলার স্বর্ণ দেয়ার প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু সেসময় মার্কিন কংগ্রেস এতে আগ্রহ দেখায়নি।

পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে, স্নায়ু যুদ্ধের সূচনালগ্নে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় ডেনমার্ককে ১০ কোটি ডলার স্বর্ণের প্রস্তাব দেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান। রাশিয়ার নিকটবর্তী অবস্থান ও আর্কটিক অঞ্চলে মস্কোর বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ট্রুম্যানের সামরিক নেতৃত্ব। তারাই সর্বসম্মতভাবে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সুপারিশ করেছিলেন।

ডেনমার্ক ট্রুম্যানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তিতে যেতে সম্মত হয়। ‘ডিফেন্স অব গ্রিনল্যান্ড অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত এ চুক্তি ১৯৫১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদিত হয়। স্নায়ু যুদ্ধের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে বহু সামরিক ঘাঁটি ও অবস্থান ছিল। বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি ঘাঁটি রয়েছে। তবে এটি কোন বাধ্যবাধকতার কারণে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফল। ১৯৫১ সালের সে চুক্তি আজও পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে এ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে থুসিডিডিসের শক্তি ও কূটনীতির ধারণাকেই সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্র যা চেয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত অর্জন করেছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিতও করেছে। তা জোরজবরদস্তি বা দখলদারির মাধ্যমে নয়, বরং জোট গঠন, পারস্পরিক সম্মতি ও সহযোগিতাভিত্তিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে।

আর্কটিক অঞ্চল কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চল এখন নতুন ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র। পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুয়েজ খালপথের তুলনায় নর্দার্ন সি রুট প্রায় ৫ হাজার মাইল ছোট আর এতে যাত্রা সময়ও প্রায় ১৪ দিন কম। গ্রিনল্যান্ডের বিশাল আয়তন ও কেন্দ্রীয় অবস্থান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কৌশলগত সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে দিতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র একা এ প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। রাশিয়া ও চীন সেখানে প্রভাব বাড়াচ্ছে। এরইমধ্যে অঞ্চলটির নতুন নৌপথ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারে আইসব্রেকার জাহাজে বিপুল বিনিয়োগ করছে মস্কো। রাশিয়ার হাতে রয়েছে প্রায় ৫০টি আইসব্রেকার জাহাজ, যার মধ্যে কয়েকটি পারমাণবিক শক্তিচালিত। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের আছে মাত্র তিনটি, তাও পারমাণবিক নয়।

এ চিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট। যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত আটটি দেশের আর্কটিক অঞ্চলে সরাসরি প্রবেশাধিকার রয়েছে। দেশগুলো হলো কানাডা, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। সম্মিলিতভাবে এ দেশগুলোর আর্কটিক উপকূলরেখা ১ লাখ মাইলেরও বেশি, যা রাশিয়ার তুলনায় পাঁচ গুণ বড়। আইসব্রেকার বহরও রাশিয়ার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো শক্তিশালী। এই পুরো ভূখণ্ড ও শক্তি-প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে।

ইতিহাসের পাঠ:

গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি দ্বীপের জন্য যদি ন্যাটোর মতো জোট দুর্বল হয়, তবে সেটি হবে এথেন্সের মতোই ভুল সিদ্ধান্ত। তবে স্বস্ত্বি কথা এই, গত সপ্তাহে দাভোসে দেয়া বক্তব্যে গ্রিনল্যান্ড দখল বা কেনার বিষয়ে আগের কড়াকড়ি অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। বরং প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের সময়ে করা চুক্তির ওপর নির্ভর করছেন তিনি। একে ‘অসীম’ ও ‘সীমাহীন’ চুক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত গ্রিনল্যান্ডে যা প্রয়োজন, তার সবই ইতিমধ্যে পেয়ে আছে। হয়তো ট্রাম্প তার প্রত্যাশিত সব কিছু নতুন করে পাবেন না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মিত্রতার মাধ্যমে যে শক্তি অর্জন করেছে, সেটিই দেশটির প্রকৃত সুপারপাওয়ার।

তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় কী কী ক্ষতি হয়েছে, সেই প্রশ্নটি এখনো উন্মুক্ত। মিত্রদের সঙ্গে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হতে লাগে বহু বছর, কিন্তু তা ভেঙে যেতে পারে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই। আশা করা যায়, গত সপ্তাহের এ নাটকীয় মোড় শেষ পর্যন্ত ন্যাটোর ভেতরে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।

সিএনএন অবলম্বনে

আরও