সৌদি আরবের অনুরোধ

হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে চাপ দিচ্ছে চীন

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এবং এখনো দেশটির জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রফতানি করা জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল

সৌদি আরব অনুরোধের পর ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেহরানকে চাপ দিচ্ছে চীন। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত তিন ইরানি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। গত এক সপ্তাহে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির তৎপরতা কারণ সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্প্রসারিত জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে রিয়াদ। খবর রয়টার্স।

চীন প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বেইজিংয়ের অপ্রকাশ্য বার্তা তাদের ওই বক্তব্যের চেয়ে আরো কঠোর ছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বেইজিং চায়, হুথিদের সংঘাত যাতে জ্বালানি পরিবহনের আরো বিস্তৃত রুটে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে তেহরান ভূমিকা রাখুক। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এসব রুটের ওপর নির্ভরশীল।

তবে বার্তাটি কীভাবে দেয়া হয়েছিল বা গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির চীন সফরের সময় তা জানানো হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত জানায়নি।

তারা বলেছে, তেহরানের জবাব ছিল—এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তি নির্ভর করছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ওপর।

তবে হুথিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে চীন তেহরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবে—এমন কোনো স্পষ্ট হুমকি দেয়া হয়নি বা এমন ইঙ্গিতও ছিল না।

এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে আরো ছড়িয়ে পড়ুক, চীন তা চায় না। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানো কোনো পক্ষের স্বার্থেই নয়।’

মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, ‘সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা যাবে না। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে—এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানায় চীন এবং সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানায়।’

অবশ্য ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এবং এখনো দেশটির জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রফতানি করা জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।

অঞ্চলটির এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ওপর এখনো চাপ দিতে পারে—এমন কয়েকটি রাজধানীর একটি হলো বেইজিং।’

১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সুন্নি ধর্মীয় প্রভাবের বিরোধিতা থেকে হুথিদের উত্থান। ইরানি সূত্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে থাকে। তারা তেহরানের পশ্চিমাবিরোধী ও ইসরায়েলবিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ।

হরমুজ প্রণালি এরই মধ্যে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরে জাহাজ বা বন্দরে হুথিদের ধারাবাহিক হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রফতানি রুট একই সময়ে ব্যাহত হবে। এতে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বৃহত্তর সংঘাতেও নতুন একটি ফ্রন্ট তৈরি হবে।

সূত্রগুলোর একজন বলেন, ইরান ও তার মিত্ররা এখন এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার দুই প্রান্তেই চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘চীন দুটির ওপরই নির্ভরশীল।’

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরোধিতা করতে পারে বেইজিং, তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ ইরানের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। চীনের আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেক আসে এ অঞ্চল থেকে। আর চীন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়।

তিন ইরানি সূত্রের মতে, বেইজিংয়ের উদ্বেগের বিষয়ে তেহরান কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।

তবে তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত চলতে থাকায় ইরানের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব যথেষ্ট।

ইরানের তেলশিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে—এমন কয়েকটি দেশের একটি হলো চীন।

কূটনৈতিক প্রভাবও দেখিয়েছে বেইজিং। ২০২৩ সালে কয়েক বছরের বৈরিতার পর ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল চীন।

তবে এ প্রভাবেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তিতে সই করার পর জ্বালানি তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় ইরানের অভ্যন্তরে সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোয় চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির তুলনায় ইরানে বিনিয়োগের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চীনকে উপেক্ষা করতে পারে না তেহরান, তবে দুই ইরানি সূত্র বলেছে, বেইজিংয়ের স্বার্থ অনেক বিবেচনার মধ্যে একটি মাত্র। তাদের মতে, পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ইরানের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়।

আরও